কলকাতায় কয়েকশো কোটির বেআইনি নির্মাণের অভিযোগ, CBI-কে তদন্তের নির্দেশ হাইকোর্টের
আজ তক | ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কলকাতার একাধিক এলাকায় কয়েকশো কোটি টাকার বেআইনি নির্মাণের অভিযোগ। রাজাবাজার, বেলেঘাটা, ক্যানাল স্ট্রিট, মানিকতলা সহ বিস্তীর্ণ এলাকায় বেআইনি নির্মাণের অভিযোগের ঘটনায় CBI-কে প্রাথমিক তদন্তের নির্দেশ দিল কলকাতা হাইকোর্ট। মামলার শুনানিতে গুরুতর অভিযোগ সামনে আসায় এই নির্দেশ দিয়েছে প্রধান বিচারপতি রবীন্দ্র ভি ঘুগে এবং বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তীর ডিভিশন বেঞ্চ। আগামী ১৪ অক্টোবরের মধ্যে CBI-কে প্রাথমিক তদন্তের রিপোর্ট আদালতে জমা দিতে বলা হয়েছে।
জনস্বার্থ মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় পুরসভার অনুমোদন বা স্যাংশান প্ল্যান ছাড়াই একাধিক নির্মাণ তৈরি করা হয়েছে। অভিযোগ, এই বেআইনি নির্মাণের পিছনে একটি বড় চক্র কাজ করছে। এমনকী কালো টাকা সাদা করার জন্যও এই নির্মাণগুলিতে বিনিয়োগ করা হয়ে থাকতে পারে বলে মামলাকারীর অভিযোগ। পুর আধিকারিকদের একাংশের সঙ্গে নির্মাণকারীদের যোগসাজশ থাকতে পারে বলেও সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে।
মামলায় প্রথমে শহরের বিভিন্ন এলাকায় বেআইনি নির্মাণের অভিযোগে একাধিক বিল্ডিংয়ের কথা আদালতের সামনে আনা হয়। প্রাথমিকভাবে ৪২টি বেআইনি বিল্ডিং চিহ্নিত করা হয়েছে বলে আদালতে জানানো হয়। অন্যদিকে, অভিযোগের পরিধি অন্তত ৫৫টি বেআইনি নির্মাণ পর্যন্ত রয়েছে বলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, এই নির্মাণগুলির কয়েকটির মালিক কারা, সেই সংক্রান্ত তথ্যও স্পষ্ট নয়। অভিযোগ অনুযায়ী, কোথাও সামান্যতম অনুমতিও নেওয়া হয়নি।
আদালতের নির্দেশে বলা হয়েছে, মামলায় গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। শহরের বেশ কিছু বেআইনি নির্মাণের বিষয় আদালতের নজরে আনা হয়েছে। অভিযোগ, এই নির্মাণগুলিতে বিপুল অঙ্কের টাকা লগ্নি করা হয়েছে। কয়েক হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের অভিযোগও উঠেছে। এই ধরনের কর্মকাণ্ড জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও আশঙ্কার কারণ হতে পারে বলে আদালত উল্লেখ করেছে।
এই পরিস্থিতিতে CBI-কে প্রাথমিক অনুসন্ধানের নির্দেশ দিয়েছে ডিভিশন বেঞ্চ। আদালত জানিয়েছে, প্রাথমিক পর্যায়ে যে নথিপত্র পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলি খতিয়ে দেখতে হবে। একইসঙ্গে পুরসভা এবং পুলিশের কাছ থেকেও প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে তদন্তের এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। প্রয়োজনে CBI বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট গঠন করতে পারে বলেও আদালত জানিয়েছে।
শুনানিতে বেআইনি নির্মাণ নিয়ে কলকাতা পুরসভার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলে আদালত। প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চের প্রশ্ন, এতদিন কেন স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে এই বিষয়ে কোনও অনুসন্ধান করা হয়নি? আদালতের বক্তব্য, বেআইনি নির্মাণের অভিযোগ উঠলে পুরসভা বা রাজ্যের তরফে স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে পদক্ষেপ করা উচিত। বেআইনি নির্মাণ হয়ে চলেছে, অথচ পুরসভা কেন নিজে থেকে তা ভাঙার ব্যবস্থা করবে না, সেই প্রশ্নও তোলে আদালত।
শুনানিতে আদালত আরও মন্তব্য করে, কলকাতায় যেমন বেআইনি নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে, তেমনই মুম্বইতেও এই সমস্যা রয়েছে। তবে বেআইনি নির্মাণের ক্ষেত্রে পুরসভার স্বতঃপ্রণোদিত পদক্ষেপ করা জরুরি। নির্মাণ বেআইনি প্রমাণিত হলে তা ভেঙে ফেলার ক্ষেত্রে পুলিশের নিরাপত্তা নিয়ে সমস্যা থাকলে সেটি আলাদা বিষয় বলে আদালত জানায়।
এদিনের শুনানিতে কলকাতা পুরসভার তরফে আদালতকে জানানো হয়, তারা বেআইনি নির্মাণ সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে আদালতে জমা দিতে চায়। তবে পুরসভার এই বক্তব্যে সন্তুষ্ট হয়নি আদালত। প্রধান বিচারপতির বেঞ্চের বক্তব্য, এভাবে বিস্তারিত তথ্য দেওয়ার কথা বলে সময় নেওয়া আসলে সময় নষ্ট করার একটি পদ্ধতি। প্রয়োজন হলে পুর কমিশনারকে আদালতে ডেকে পাঠানো হতে পারে বলেও জানায় বেঞ্চ। আদালতের মন্তব্য, আধিকারিকেরা কাজ করার জন্য বেতন পান, কাজ না করার জন্য নয়।
এরই মধ্যে কলকাতা পুরসভার দেওয়া রিপোর্ট অনুযায়ী, চিহ্নিত নির্মাণগুলিকে বেআইনি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতেই আদালত আরও অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তা দেখেছে।
মামলাকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মার্চ মাসে তিনি জানতে পারেন যে কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় পুরসভার সঙ্গে যোগসাজশ করে সম্পূর্ণ বেআইনি ভাবে একাধিক ফ্ল্যাট তৈরি করা হয়েছে। অভিযোগ, সরকারি সম্পত্তি ব্যবহার করেও কোথাও কোনও স্যাংশান প্ল্যান ছাড়াই নির্মাণ গড়ে তোলা হয়েছে। এই নির্মাণগুলির তৈরি ও পরবর্তী কেনাবেচার সঙ্গে কালো টাকার বিনিয়োগ জড়িত থাকতে পারে বলেও মামলাকারী অভিযোগ করেন।
এই সমস্ত অভিযোগের ভিত্তিতেই আদালতের দ্বারস্থ হন মামলাকারী। শুনানির পর আদালত প্রাথমিক তদন্তের দায়িত্ব CBI-কে দিয়েছে। পুরসভা ও পুলিশের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় নথি ও তথ্য সংগ্রহ করে অভিযোগগুলির প্রাথমিক সত্যতা খতিয়ে দেখবে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। আগামী ১৪ অক্টোবর আদালতে সেই প্রাথমিক রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।