যুদ্ধের আগুনে পুড়ছে পশ্চিম এশিয়া। কিন্তু এর প্রভাব পড়েছে গোটা বিশ্বে। এই পরিস্থিতিতে ব্রিকসের মঞ্চে এক অভূতপূর্ব এবং ঐতিহাসিক কূটনৈতিক সাফল্যের সাক্ষী থাকল ভারত। সমস্ত মতপার্থক্য দূর করে দিল্লি ঘোষণাপত্রে ঐক্যমত পোষণ করল ব্রিকস সদস্যভুক্ত দেশগুলি। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে যাদের সম্পর্কের মধ্যে তীব্র টানাপড়েন তৈরি হয়েছিল, সেই ‘শত্রু’ ইরান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহীও দিল্লি ঘোষণাপত্রে একই অবস্থানে এল।
কী রয়েছে এই ঘোষণাপত্রে? একাধিক সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ঘোষণাপত্রে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে, যুদ্ধ কোনওদিন সমস্যা সমাধানের পথ হতে পারে না। এতে অশান্তি দ্বিগুণ বৃদ্ধি পায়, যার ভুক্তভোগী হয় গোটা বিশ্ব। আলোচনা এবং কূটনৈতিক পথই দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতির সবচেয়ে কার্যকর রাস্তা। যুদ্ধ বা সংঘাত নয়, পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমেই আন্তর্জাতিক সমস্যার সমাধান খোঁজার পক্ষে সওয়াল করা হয়েছে ঘোষণাপত্রে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল – সন্ত্রাসবাদ নিয়ে একই অবস্থানে এসেছে ব্রিকস সদস্যভুক্ত দেশগুলি। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করার বার্তা দেওয়া হয়েছে ঘোষণাপত্রে। তবে সেখানে সরাসরি কোনও দেশের নাম না থাকলেও, কূটনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এর মাধ্যমে আসলে পাকিস্তানকেই ঘুরিয়ে বার্তা দেওয়া হল। শনিবার বিকেল ৪টে নাগাদ ব্রিকসে গৃহীত হয় দিল্লি ঘোষণাপত্রটি।
ঘোষণাপত্রে সবার সহমতি নিতে রীতিমতো বেগ পেতে হয়েছে দিল্লিকে। বিশেষত, ইরান এবং আমিরশাহীর ‘সংঘাত’ পরিস্থিতি জটিল করে তোলে। জানা গিয়েছে, ইরানে মার্কিন ও ইজরায়েলি হামলার তীব্র নিন্দার দাবি জানিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেস্কিয়ান। তিনি সাফ বলেন, “দিল্লি ঘোষণায় মার্কিন ও ইজরায়েলি আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা করতে হবে।” এতেই ক্ষিপ্ত হয় আমিরশাহী। তারা পালটা দাবি করে, ইরানের হামলারও নিন্দা করতে হবে। ফলত পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় ঘোষণাপত্রে নিজেই নিজের নিন্দা করতে হবে তেহরানকে। এই জটিল মুহূর্তেই মোদির দৌত্য সাফল্যের বার্তা বয়ে আনে। দিল্লি ঘোষণাপত্রে মতানৈক্য ঘুচিয়ে আলোচনায় বসার সিদ্ধান্তকেই স্বীকৃতি দেয় আবু ধাবি ও তেহরান।
লক্ষ্যণীয়, দিল্লি ঘোষণাপত্রে বিশ্বজুড়ে চলা শুল্কযুদ্ধ তথা আন্তঃসীমান্ত ঠাঁই পেয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, চিন-রাশিয়া-ইরানকে এক মঞ্চে এনে পাকিস্তানকে বার্তা দিতে সক্ষম হয়েছে ভারত। আর এখানেই মোদি সরকারের কূটনৈতিক সাফল্য। তবে ব্রিকসের পরতে পরতে একাধিক সমীকরণের জাল বোনা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, দিল্লি ব্রিকস সম্মেলন খানিকটা হলেও আমেরিকার রাতের ঘুম কাড়বে। কারণ, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হতে আন্তর্জাতিক মঞ্চে রাশিয়াকে একঘরে করে ফেলার চেষ্টা শুরু করেছিল আমেরিকা। মার্কিন তালে তাল মিলিয়েছিল ব্রিটেন ফ্রান্স জার্মানির মতো পশ্চিমা দেশগুলি। কিন্তু ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে সেই চেষ্টা যে কতটা ভঙ্গুর, তা বোঝা যাচ্ছে। মার্কিন ‘আধিপত্যবাদ’কে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দিল্লি দরবারে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছেন নরেন্দ্র মোদি, ভ্লাদিমির পুতিন, শি জিনপিং, মাসুদ পেজেস্কিয়ানদের মতো তাবড় রাষ্ট্রনেতারা। রয়েছেন কিউবা, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী, মিশরের প্রতিনিধিরাও। বিশ্বের জিডিপির ৪০ শতাংশই ব্রিকস দেশগুলোর। ফলত, আন্তর্জাতিক আঙিনায় কে এক ঘরে, আর কার দাপট বাড়ছে তা স্পষ্ট।