রূপক সরকার, বালুরঘাট
একে গাড়ির ধোঁয়া, মায় জ্বালানি খরচ। তার মধ্যে আবার কমছে ইঞ্জিনের কর্মক্ষমতা। এই ত্রিমুখী সমস্যায় জেরবার গাড়িচালকরা। এ বার এই তিন সমস্যার সমাধান একসঙ্গে মিলতে পারে মাত্র কয়েক ফোঁটা সংযোজক দ্রব্যে! দীর্ঘ ১৫ বছরের গবেষণার পরে এমনটাই দাবি করল দক্ষিণ দিনাজপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রণব ঘোষের নেতৃত্বাধীন গবেষক দল। সম্প্রতি তাঁদের তৈরি 'লিকুইড ক্রিস্টাল ব্লেন্ডেড অক্টাইল অ্যাক্রিলেট বেসড বায়োডিগ্রেডেবল লুব্রিক্যান্ট অ্যাডিটিভস' নামক ওই বিশেষ সংযোজক দ্রব্যের (মিশ্রণ) স্বীকৃতি মিলেছে ভারত সরকারের পেটেন্টে।
রসায়নের অধ্যাপক প্রণবের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের ওই দলের এমন সাফল্যে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি প্রযুক্তিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। গবেষকদের দাবি, তাঁদের তৈরি ওই বিশেষ অ্যাডিটিভ পেট্রল-ডিজেলে মেশালে মোটরবাইক কিংবা গাড়িতে কম করে পাঁচ কিলোমিটার বেশি মাইলেজ পাওয়া যাবে। ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি ফুয়েল অ্যাডিটিভসংস্থা তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছেন। সব ঠিক থাকলে আগামীদিনে ওই বিশেষ অ্যাডিটিভপেট্রল-ডিজেলের পাম্পে মিলবে।
গবেষকদের দাবি, জ্বালানিতে এই সংযোজক দ্রব্য মেশালে ইঞ্জিনের কর্মক্ষমতা যেমন বাড়বে, তেমনই দূষণকারী বিভিন্ন উপাদানের নির্গমন অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে। এ ছাড়াও ওই দ্রব্য ফুয়েল ইনজেক্টর পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করবে। ইঞ্জিনের ভিতরে ময়লা ও কার্বন জমা হওয়ার সমস্যাও কমাবে বলে দাবি গবেষক দলের। এতে জ্বালানি সাশ্রয়ের পাশাপাশি গাড়ির মাইলেজ বাড়ার সম্ভাবনার কথা বলেছেন গবেষকরা। এখানেই শেষ নয়। ওই অ্যাডিটিভদীর্ঘদিন ব্যবহার করলে ইঞ্জিনের স্থায়িত্বও বাড়তে পারে বলে দাবি গবেষকদের। এই আবিষ্কারের পিছনে রয়েছে লুব্রিকেন্ট অ্যাডিটিভ তৈরিতে বিদেশি প্রযুক্তি এবং আমদানির উপরে নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যও।
প্রণবদের মতে, বাণিজ্যিক ভাবে এই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে দেশীয় শিল্পের পাশাপাশি গ্রিন-টেক ক্ষেত্রেও নতুন দরজা খুলতে পারে। পেট্রল ও ডিজেলের মতো প্রচলিত জ্বালানি ইঞ্জিনে পোড়ার সময়ে কার্বন মনোক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড এবং কার্বন কণার মতো ক্ষতিকর উপাদান তৈরি হয়। আবিষ্কৃত অ্যাডিটিভের মাধ্যমে জ্বালানি ব্যবহারের প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকরী করে এই ধরনের নির্গমন কমানো যাবে বলে দাবি গবেষকদের। এই গবেষণার পিছনে তিন বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ সহযোগিতা রয়েছে। পাঁচ সদস্যের গবেষক দলে রয়েছেন উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী সায়নী দাস এবং মণিষিতা নন্দী। রয়েছেন উত্তরপ্রদেশের নয়ডার শিব নাদার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুশান্ত সিনহা রায় এবং ছাত্রী তনুজা সিং। পেটেন্টে তিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
অধ্যাপক প্রণবের গবেষণা জীবনে এটি একটি বড় সাফল্য। বোম্বে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করার পরে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন তিনি। বর্তমানে দঃ দিনাজপুরের উপাচার্য, ৬২টি বছরের প্রণবের ঝুলিতে এ নিয়ে মোট আটটি পেটেন্ট হয়ে গিয়েছে। তিনি বলছেন, 'জ্বালানির সঙ্গে সামান্য ওই সংযোজক মেশালে ইঞ্জিন থেকে দূষণমুক্ত ধোঁয়া নির্গত হবে। ইঞ্জিনের দীর্ঘায়ু হবে এবং কর্মক্ষমতাও বৃদ্ধি পাবে। এটি পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি। আগামীতে আত্মনির্ভর ভারত গড়ার লক্ষ্যে এই আবিষ্কার কাজে লাগবে। আমাদের ১৫ বছরের গবেষণার ফল এ বার কাজে লাগবে।'