অরিন্দম বন্দ্যোপাধ্যায়, নয়াদিল্লি
খাতায়কলমে তাঁর বয়স ৮১৷ এখন সামান্য ঝুঁকে হাঁটলেও যথেষ্ট গতি আছে তাঁর চলাফেরায়৷ সব সময়েই তাঁকে দেখা যায় অফিশিয়াল ড্রেস কোডে৷ দিল্লিতে প্রাতরাশ বৈঠক, দুপুরে উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়িতে চিকেন্স নেকে কম্যান্ডার্স কনফারেন্স, বিকেলে ত্রিপুরার আগরতলায় বিএসএফের শীর্ষকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক সেরে দিল্লি ফিরে ফের মাঝরাত পর্যন্ত দেশের নিরাপত্তা নিয়ে জরুরি বৈঠক— এক একদিন এমনও ব্যস্ত রুটিন মেনে চলেন তিনি। তিনি দেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল।
দিল্লিতে আয়োজিত ব্রিকস সম্মেলনকে হাতিয়ার করে এ বার 'ঘর' গুছিয়ে ফেললেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল৷ একদিকে সন্ত্রাসবাদ ইস্যুতে পাকিস্তানকে আরও কোণঠাসা করা, অন্য দিকে লাদাখ–অরুণাচল প্রদেশ–সিকিম সীমান্তে চিনা আগ্রাসন ঠেকাতে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে শুক্রবার গভীর রাত এবং শনিবার সকাল পর্যন্ত ডোভাল একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক সেরেছেন বলে সূত্রের দাবি। রাশিয়া, চিন, ইরান, ব্রাজি়ল, ইথিওপিয়া, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা সরকারের শীর্ষ স্তরের মন্ত্রী ও আমলাদের সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি আবু ধাবির ক্রাউন প্রিন্সের সঙ্গেও একান্ত বৈঠক করেছেন ডোভাল, এমনই দাবি সরকারি সূত্রের৷
ব্রিকসে যোগ দেওয়ার জন্য ২০২৩–এ আনুষ্ঠানিক ভাবে আবেদন করেছিল পাকিস্তান। উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলিকে নিয়ে গঠিত এই জোটে ব্রাজি়ল, রাশিয়া, ভারত, চিন ও দক্ষিণ আফ্রিকার পাশাপাশি গত বছর মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহি যোগ দেওয়ায় এটি ব্রিকস+ হিসেবে আরও সম্প্রসারিত হয়েছে। তবে ভারতের আপত্তির কারণে ইসলামাবাদের সদস্যপদ পাওয়ার চেষ্টা এখনও সফল হয়নি। যে ২৯টি দেশ ব্রিকসের সদস্যপদের জন্য আবেদন করেছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো পাকিস্তান। সূত্রের দাবি, পাকিস্তানের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং সন্ত্রাসবাদে মদতের স্পষ্ট অভিযোগ ওঠা তাদের এই জোটে যোগদানের পথে বড় বাধা বলে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকে তুলে ধরেন ডোভাল। ব্রিকস–এর সদস্য দেশগুলির প্রতিনিধিদের একজোট করে সন্ত্রাসের মদতদাতা হিসেবে চিহ্নিত পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে একঘরে ও কোণঠাসা করাই ছিল ডোভালের এই দৌত্যের প্রধান লক্ষ্য৷ সূত্রের দাবি, এই মর্মেই সাফল্য পেয়েছেন তিনি৷ ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চিন— ব্রিকস-এর এই চারটি মূল স্তম্ভ পাকিস্তানকে কোনওদিন এই গোষ্ঠীর সদস্যপদ আদৌ দেবে কি না, সেই প্রশ্নও থাকছে৷
ডোভালের এই অবস্থান যে কতটা প্রাসঙ্গিক, তা স্পষ্ট হয়েছে ব্রিকস-এর সম্মিলিত ঘোষণাপত্রে, যেখানে এক বাক্যে পহেলগামে জঙ্গি হামলার নিন্দা করেছে চিন–সহ ব্রিকসের সব সদস্য দেশ৷ এই ঘোষণাপত্র ভারতের জন্য বড় কূটনৈতিক জয়— দাবি করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা৷ এর ফলে আন্তর্জাতিক মঞ্চে চাপ বাড়বে পাকিস্তানের৷ সূত্রের দাবি, ডোভালের এই সক্রিয়তা এবং পারদর্শিতায় মুগ্ধ রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন শুক্রবার সন্ধেয় দিল্লিতে প্রকাশ্যে তাঁর দিকে হাত নেড়ে অভিবাদন জানিয়েছেন৷ পুতিনকে প্রতি নমস্কার করে সৌজন্য বজায় রেখেছেন ডোভালও৷ তাত্পর্যপূর্ণ হলো, এমন একটা সময়ে ডোভাল তাঁর ক্যারিশমা দেখালেন, যখন চিনের ভূমিকা নিয়েও ভারত সন্দিগ্ধ ছিল৷
চিন 'অপারেশন সিঁদুরে'র সময়ে পাকিস্তানকে সহযোগিতা করেছে, ইনটেলিজেন্স ইনপুট দিয়েছে বলে চিনের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছিল, সেই চিন উপমহাদেশ থেকে সন্ত্রাস দূর করার প্রসঙ্গে ভারতের পাশে দাঁড়াবে কি না, এটা নিয়েই ছিল দোলাচল৷ ডোভাল তাঁর দৌত্যের মাধ্যমে এই বাধা টপকেছেন এবং ভারত ও চিনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও মজবুত করার দিকে অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছেন বলেই সরকারি সূত্রের দাবি৷