• ‘হিন্দু বাঙালিদের অবস্থা হতে পারত চিন্ময়কৃষ্ণের মতো’, সরব মুখ্যমন্ত্রী
    এই সময় | ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • এই সময়: শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জন্যই পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বলে বরাবর দাবি করে এসেছে বিজেপি। পশ্চিমবঙ্গকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ঢোকানোর পরিকল্পনা শ্যামাপ্রসাদ কী ভাবে রুখে দিয়েছিলেন, তার বর্ণনা বিভিন্ন সভা–সমিতি থেকে নিয়ম করে দিতে দেখা যায় পদ্ম–নেতৃত্বকে। কিন্তু শ্যামাপ্রসাদ না–থাকলে এ পার বাংলার হিন্দু বাঙালিদের কী অবস্থা হতো? শনিবার সেটাই উদাহরণ দিয়ে ব্যক্ত করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।

    এ দিন নিউ টাউনে গণেশ পুজোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসে তিনি বলেন, ‘ওপার বাংলার চিন্ময় প্রভুর চোখের জল গোটা পৃথিবীর সনাতনীদের হৃদয় নাড়িয়ে দিয়ে গিয়েছে। আমি ওই চোখের জল দেখতে দেখতে ভাবছিলাম, আমরা যদি সে দিন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, প্রণবানন্দ মহারাজের লড়াইয়ের মাধ্যমে ভারতভুক্ত না হতাম, তা হলে আজ আমাদের অবস্থাও চিন্ময় প্রভুর মতোই হতো।’

    ২০২৪–এর নভেম্বর থেকে বাংলাদেশে জেলবন্দি সন্ন্যাসী চিন্ময়কৃষ্ণ। গত বৃহস্পতিবার তাঁর মায়ের মৃত্যু হয়। সেই প্রেক্ষিতে চিন্ময়কৃষ্ণের আবেদন বিবেচনা করে তাঁকে পাঁচ ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তির নির্দেশ দেয় চট্টগ্রামের আদালত। মা সন্ধ্যারানি ধরের শেষকৃত্যে হাজির হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা যায় চিন্ময়কৃষ্ণকে। জানা গিয়েছে, মৃত্যুর আগে চিন্ময়কৃষ্ণের মায়ের শেষ ইচ্ছে ছিল কারাবন্দি ছেলেকে দেখার। কিন্তু আবেদন করেও চিন্ময়কৃষ্ণ জামিন পাননি বলে অভিযোগ। গণেশ পুজোর উদ্বোধনে এসে সেই প্রসঙ্গই উত্থাপন করেন শুভেন্দু। তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, শ্যামাপ্রসাদের মতো মানুষরা না থাকলে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু বাঙালিদেরও চিন্ময়কৃষ্ণের মতো এখন চোখের জল ফেলতে হতো।

    দেশভাগের ক্ষত যে তাঁর পরিবারেও আছে, এ দিন সে কথাও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘বিভীষিকাময় দেশভাগ আমাদের অনেক ক্ষতি করেছে। আমার নিজের জীবনে যন্ত্রণার অনুভূতি আছে। শুধুমাত্র হিন্দু হওয়ার কারণে আমার মাতৃদেবীকেও বরিশাল থেকে তাঁর পিতৃদেবের হাত ধরে পালিয়ে আসতে হয়েছে।’ ওপার বাঙলা থেকে হিন্দুদের পালিয়ে আসার ইতিহাস কমিউনিস্টরা গুলিয়ে দিতে চেয়েছে বলে এ দিন শুভেন্দু অভিযোগ করেন।

    তিনি বলেন, ‘বাঙালি হিন্দুর হোমল্যান্ড তৈরির দাবি আদায়ের জন্য শ্যামাপ্রসাদ, স্বামী প্রণবানন্দের যে লড়াই, ভূমিকা, তাকে বাম আর তৃণমূল ভুলিয়ে দিতে চেয়েছিল। সেই ঐতিহ্য, পরম্পরা ফিরিয়ে আনতে চাই।’ জবাবে সিপিএম নেতা কলতান দাশগুপ্ত বলেন, ‘আমরা বামপন্থীরা সব সময়েই দেশের সীমান্তের ঊর্ধ্বে উঠে সংখ্যালঘুদের অধিকারের পক্ষে এবং সংখ্যাগুরুর আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে। সেটা বাংলাদেশ, ভারত বা প্যালেস্তাইন সর্বত্র।’ কলতান বরং আঙুল তুলেছেন বিজেপির দিকে। তাঁর কথায়, ‘বিজেপি এ ব্যাপারে দ্বিচারিতা করছে। ওখানে চিন্ময়কৃষ্ণকে যে ভাবে দেশদ্রোহী বলে বন্দি রাখা হয়েছে, এখানে একই ভাবে উমর খলিদও বন্দি। দেশদ্রোহী তকমা দিয়ে স্ট্যান স্বামীকেও জেলে রাখা হয়েছিল। তাঁকে কারাগারেই মরতে হয়েছে। বিজেপির দ্বিচারিতা ক্রমশ প্রকট হচ্ছে মানুষের সামনে।’

    চিন্ময়কৃষ্ণ ইস্যুতে শুক্রবার সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি পোস্টে আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকি বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ায় সংখ্যালঘু হয়ে জন্মানোটা বোধহয় সবথেকে বড় অপরাধ।’ তাঁর মতে, ‘এই ঘটনা আজকের দক্ষিণ এশিয়ার মানবাধিকার পরিস্থিতির একটি নির্মম প্রতীক হয়ে উঠেছে।’ চিন্ময়কৃষ্ণ দাসের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও তাঁকে মানবিক মর্যাদা দেওয়া উচিত ছিল বলে দাবি নওশাদের। তাঁর কথায়, ‘একজন অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রথমে একজন মানুষ। আর মানবাধিকার সেই মানুষের মৌলিক অধিকার।’

    সম্প্রতি হাওড়ার লিলুয়ায় এসেছিলেন বাগেশ্বর বাবা ওরফে ধীরেন্দ্রনাথ শাস্ত্রী। দুর্গাপুজোর সময়ে বাঙালিদের আমিষ খাওয়ার রীতি নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন। যা নিয়ে তুমুল বিতর্কও হয়। এ দিন একটি টিভি চ্যানেলের সামিটে হাজির হয়ে ভারতীয় সংস্কৃতি পরম্পরার কথা বলতে গিয়ে সেই প্রসঙ্গ টেনে আনেন মুখ্যমন্ত্রী। বলেন, ‘উনি কিছু চাপিয়ে দেননি। শাক্ত এবং বৈষ্ণব দুই প্রথাই হিন্দু ধর্মে আছে। কে কোনটা মানবেন, সেটা তাঁর নিজস্ব ব্যাপার। তাই বলে কোনও সাধুকে গালাগাল দেওয়া বরদাস্ত করা হবে না। এ সব পশ্চিমবঙ্গে চলবে না।’

    তৃণমূল জামানায় বাংলাদেশ থেকে কিছু ধর্মগুরু এসে প্ররোচনামূলক ভাষণ দিতেন বলে বিজেপির অভিযোগ। এ দিন সেই সূত্র ধরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমি আপনাদের শুনিয়ে দিতে পারি, বাংলাদেশ থেকে এক হুজুর বসিরহাটে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এসে দু’বছর আগে বলেছিলেন, আমেরিকার কাছে পরমাণু অস্ত্র আছে। আমরা জনবিস্ফোরণ ঘটিয়ে পরমাণু অস্ত্রকে ধ্বংস করে দিতে পারি।’ মুুখ্যমন্ত্রীর দাবি, এই কারণেই বাংলায় জাগরণ প্রয়োজন। হিন্দু সংস্কৃতি, পরম্পরা ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন।

  • Link to this news (এই সময়)