• দুর্গার আগে লোহার তলোয়ার পুজো, বাংলার এই বনেদি বাড়ির উমা আরাধনায় অংশ নিত ব্রিটিশরাও
    প্রতিদিন | ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • গোটা বছর শেষে উমা আসছেন বাপের বাড়ি। তার আদর আপ্যায়ণের বন্দোবস্তই অন্যরকম। তোড়জোড়ে কোনও খামতি রাখতে চান না কেউ। তবে পূর্ব মেদিনীপুরের সুতাহাটার জামালচক গ্রামের দেব পরিবারে দুর্গার আগে পুজো করা হয় লোহার তলোয়ারের। এই বংশেরই কোনও বংশধর রূপনারায়ণ থেকে দু’টি খড়্গ পান। সেটিকেই প্রথমে পুজো করা হয়। সময় বদলালেও, ১৮৯ বছরের প্রাচীন এই পুজোয় আজও অটুট ঐতিহ্য।

    পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, রাজা যাদবরাম রায়ের জামাই ছিলেন দেব পরিবারের পূর্বপুরুষ। ১৮৩৭ সালে রাজা যাদবচন্দ্র রায় তাঁর মেয়ের বাড়িতে দুর্গাপুজোর প্রচলন করেন। তারও আগে স্বপ্নাদেশে রূপনারায়ণ নদী থেকে দুটি খড়্গ পাওয়া যায়। সেই খড়্গকে পুজো করার রীতি থেকেই দেব পরিবারের দুর্গোৎসবের সূচনা। আজও সেই ঐতিহ্য মেনে প্রথমে প্রায় সাড়ে তিন ফুট লম্বা লোহার তরবারির পুজো হয়। এরপর শুরু হয় দেবীর আরাধনা।

    রাধাষ্টমীর দিন নিয়ম মেনে মাটি তোলার পর প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু হয়। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিমার কাঠামোতে কোনও পরিবর্তন হয়নি। একচালার প্রতিমাতেই পুজো হয়ে আসছে। একসময় জমিদারি আমলের বিপুল আড়ম্বর থাকলেও বর্তমানে আর্থিক কারণে সেই জাঁকজমক অনেকটাই কমেছে। আগে হাজার হাজার মানুষকে ভোগ খাওয়ানো, বাজনা এবং পাচাল গানের আসর বসত। এখন সেই আয়োজন আর নেই। পুজোর আচার-অনুষ্ঠানে এখনও ক্ষত্রিয় ঘরানার ছাপ স্পষ্ট। সপ্তমীর দিন থেকে শুরু হয় হোমযজ্ঞ, যা নবমীতে গিয়ে শেষ হয়। অষ্টমীর সন্ধিপুজোয় ১০৮টি পদ্ম এবং ১০৮টি প্রদীপ দিয়ে দেবীর আরাধনা করা হয়। একসময় ষষ্ঠী থেকে প্রতিদিন এক কুইন্টাল আতপ চালের ভোগ দেওয়া হত। বর্তমানে সেই পরিমাণ কমে প্রায় এক মণ চালের ভোগ দেওয়া হয়।

    একসময় দেব পরিবারের পুজোর জন্য কোনও পাকা মন্দির ছিল না। গত ২০১২ সালে তৈরি হয় মাতৃমন্দির ও মন্দির চত্বর। তারপর থেকেই যাবতীয় আচারবিধি মেনে মন্দিরেই দুর্গাপুজো হয়ে আসছে। আগের দিনে প্যান্ডেলের চল ছিল না। হ্যাচাকের আলোতে আলোকিত হত পুজো প্রাঙ্গণ।

    এখন সময়ের সঙ্গে প্যান্ডেল ও বৈদ্যুতিক আলোর ব্যবহার শুরু হয়েছে। এই পরিবারের সঙ্গে ব্রিটিশ আমলেরও যোগাযোগ ছিল বলে পরিবার সূত্রে জানা যায়। পুজোয় ব্রিটিশদের উপস্থিতির কথাও পরিবারের প্রবীণদের মুখে শোনা যায়। পাশাপাশি স্বাধীনতা আন্দোলনেও পরিবারের সদস্যদের ভূমিকা ছিল বলে জানা যায়। সেই সময় পরিবারের কয়েকজন সদস্য জেলও খেটেছিলেন।

    সময়ের সঙ্গে দেব পরিবারের সদস্যরা ছড়িয়ে পড়েছেন কলকাতা, ওড়িশা, হলদিয়া ও সুতাহাটার বিভিন্ন এলাকায়। তবে জামালচকের আদি বাড়ি ও মাটির বাড়ির কিছু অংশ এখনও পুরনো দিনের স্মৃতি বহন করছে। গত পাঁচ বছর ধরে শ্রীশ্রী রঘুনাথ জিউর ট্রাস্ট বানিয়ে পুজোর আয়োজন পরিচালিত হচ্ছে বলে পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে।বর্তমানে রাজকীয় আড়ম্বর না থাকলেও রীতিনীতি ও ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে দেব পরিবারের দুর্গাপুজো আজও স্বমহিমায়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা সেই বনেদিয়ানা ও খড়্গ পুজোর প্রথাই এই দুর্গোৎসবের অন্যতম বিশেষ আকর্ষণ। পরিবারের সদস্য প্রদীপ দেব ও দেবাশিস দত্ত জানান, আড়ম্বর কমলেও পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া রীতিনীতি মেনেই পুজো চালিয়ে যাওয়াই তাঁদের মূল লক্ষ্য।
  • Link to this news (প্রতিদিন)