এই সময়: জীববৈচিত্রের ‘হটস্পট’ হিসেবে প্রাণিবিজ্ঞানীদের নিয়মিত অবাক করেই চলেছে পশ্চিমঘাট পর্বতমালা। মহারাষ্ট্রের পশ্চিমঘাট থেকে মাটির নীচে লুকিয়ে থাকা এক অদ্ভুত উভচর প্রাণীর সন্ধান পেলেন গবেষকরা। কেঁচোর মতো দেখতে, পা-বিহীন এই প্রাণীকে সাধারণত ‘সিসিলিয়ান’ বলা হয়। তবে, যার খোঁজ পাওয়া গিয়েছে, সেটি সিসিলিয়ানের একেবারে নতুন একটি প্রজাতি। এই প্রজাতিটির নাম দেওয়া হয়েছে গেজিনিওফিস চাঁদগড়ি। এই নামটি এসেছে কোলহাপুরের চাঁদগড় এলাকার স্থানীয় মারাঠি উপভাষা ‘চাঁদগড়ি’ থেকে। স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতিকে সম্মান জানাতেই এই নামকরণ বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।
জ়ুলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (জ়েডএসআই)–র পুনের ওয়েস্টার্ন রিজিওনাল সেন্টার (ডব্লিউআরসি), হালকর্ণির যশবন্তরাও চহ্বন মহাবিদ্যালয়, সাবিত্রীবাই ফুলে পুনে বিশ্ববিদ্যালয় এবং গোয়ার মহাদেই রিসার্চ সেন্টারের গবেষকদের মিলিত প্রয়াসেই এই আবিষ্কার। গবেষণার বিস্তারিত ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে জে়ডএসআইয়ের রেকর্ডসে।
চাঁদগড়ের বুজাওয়াড়ে এলাকার যে জায়গা থেকে এই প্রাণীর খোঁজ মিলেছে, সেটি কোনও গভীর সংরক্ষিত অরণ্যে নয়, সেই জায়গা মানুষের বসতি ও কৃষিজমির কাছাকাছি। সেখানেই মাটির নীচে বাস করছিল এই প্রাণী। জ়েডএসআই–এর অধিকর্তা ধৃতি বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য, ‘বনসীমার বাইরে মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারের জমিতেও যে বহু অজানা প্রাণী টিকে থাকতে পারে, এই আবিষ্কার তারই প্রমাণ।’ প্রাণীটি দেখতে কেঁচো বা চোখহীন সাপের মতো হওয়ায় শুধু বাহ্যিক চেহারা দেখে তাকে আলাদা করা কঠিন। তাই গবেষকরা তার দেহের গঠন, বিভিন্ন শারীরিক বৈশিষ্ট্য এবং জিনগত তথ্য একসঙ্গে পরীক্ষা করেন। সেই বিশ্লেষণেই নিশ্চিত হয়, এটি আগে নথিভুক্ত কোনও প্রজাতি নয়।
বিশ্বজুড়ে উভচরদের অস্তিত্ব এখন গভীর সঙ্কটে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৪১ শতাংশ উভচর প্রজাতিই বিলুপ্তির আশঙ্কায় রয়েছে। ভারতে পাওয়া ৪৫৮টি উভচর প্রজাতির মধ্যে সিসিলিয়ানই ৪১ প্রজাতির। নতুন এই আবিষ্কারের ফলে ‘গেজেনিওফিস’ গণের ভারতীয় প্রজাতির সংখ্যা বেড়ে হল ১২। এর মধ্যে ১১টিই পশ্চিমঘাটের নিজস্ব প্রজাতি।
গবেষকদের এই আবিষ্কার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে করিয়ে দিচ্ছে। পশ্চিমঘাটের জীববৈচিত্র শুধু গাছপালা, পাখি বা বড় স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মাটি, পচা পাতা, কৃষিজমি এবং মানুষের বসতির আশপাশেও অতি গোপনে বেঁচে থাকতে পারে বিরল প্রাণী। স্থানীয় বাসিন্দাদের পরিবেশ সম্পর্কে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা এই ধরনের অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে। চাঁদগড়ির নাম গ্রহণ তাই শুধু সম্মান প্রদর্শন নয়, স্থানীয় মানুষ ও বিজ্ঞানীদের সহযোগিতারও স্বীকৃতি। নতুন প্রজাতির সন্ধান বিজ্ঞানকে সমৃদ্ধ করছে, প্রকৃতি রক্ষার প্রয়োজনও স্পষ্ট করছে।