জীবনে চলার পথে অনেক কঠিন সময় এসেছে। সেসব সময় পাশে থেকেছেন স্ত্রী। তাঁর হাসি মুখের দিকে তাকিয়ে অনেক কঠিন পথও তিনি পেরিয়েছেন। স্ত্রী এখন বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভুগছেন। দীর্ঘ ছয়মাস ধরে শয্যাশায়ী। চেহারা, মুখের চামড়ায় অনেক আগেই ভাঁজ পড়েছে। কিন্তু জীবন সায়াহ্নে এসেও স্ত্রীর প্রথম জীবনের মুখের হাসি এখনও ভোলেননি অশীথিপর ভূপতিরঞ্জন দেবনাথ। সেই মুখ ও হাসি ধরে রাখতে নিজের হাতেই গড়ে তুলেছেন স্ত্রীর সেই মুখ।
উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রামের বাসিন্দা ৮৮ বছরের ভূপতিরঞ্জন দেবনাথ। মধ্যমগ্রাম হাই স্কুলেই শিক্ষকতা করতেন তিনি। প্রায় তিনদশক আগে তিনি কর্মক্ষেত্র থেকে অবসর নিয়েছেন। ৭০-এর ঘরে বয়স তাঁর স্ত্রী অঞ্জলির। ওই দম্পতির দুই মেয়ে ও এক ছেলে। মধ্যমগ্রাম এলাকাতেই দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে। পুত্রবধূ ও নাতি রয়েছে বাড়িতে। করোনা অতিমারির সময়ে একমাত্র ছেলেকে হারিয়েছেন ভূপতি ও অঞ্জলি। পুত্রবধূ ও নাতির দায়িত্ব তাঁদেরই উপর।
পেনশনের টাকাতেই চলে ভূপতির সংসার। এদিকে স্ত্রী গত ছয়মাস ধরে অসুস্থ হয়ে বিছানায়। বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভুগছেন তিনি। এতটাই অসুস্থ যে, হাতে কলম ধরে সই পর্যন্ত এখন করতে পারেন না অঞ্জলি। স্ত্রীর পুরনো মুখ ও হাসিকে বাঁচিয়ে রাখতে ভূপতি নিজে হাতেই তৈরি করেছেন তাঁর মুখ। ছাত্র পড়ানোর পাশাপাশি হাতের কাজেও অত্যন্ত দক্ষ, নিপুণ ছিলেন ভূপতি। সেসময় বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে একাধিক জিনিসপত্র বানিয়েছেন। কখনও মাটি, নারকেলের খোল, গাছের ডাল… ফেলে দেওয়া সাধারণ জিনিসপত্র তাঁর হাতেই প্রাণ পেয়েছে। সেইসব জিনিসপত্র বাড়ির বিভিন্ন জায়গায় সযত্নে রাখা রয়েছে।
স্ত্রী অসুস্থ হওয়ার পর তাঁর পুরনো সেই অমলিন হাসিকে মনে রেখে অঞ্জলির একটি হাস্যমুখও তৈরি করেছেন ৮৮ বছরের ভূপতিরঞ্জন। স্ত্রীর প্রথম জীবনের হাসিকে বাঁচিয়ে রাখতেই এই পদক্ষেপ বলে জানানো হয়েছে। ঘরের মধ্যে একটি শোকেসে স্ত্রীর ওই হাসিমুখের প্লাস্টার অফ প্যারিসের প্রতিকৃতি রয়েছে। কিন্তু কেন এমন ভাবনা? বৃদ্ধ জানিয়েছেন, ৫৯ বছরের দাম্পত্য জীবন তাঁদের। বরাবরই হাসতে ভালোবাসেন স্ত্রী। সংসারে অনেক কঠিন সমত এলেও বুঝতে দেননি তিনি। হাসিমুখেই সব কিছু সামলে দিয়েছেন।
এখন বৃদ্ধা স্ত্রী অসুস্থ হয়ে বিছানায়। ওঠার শক্তিও নেই। মুখের হাসিও মিলিয়ে গিয়েছে। কিন্তু ভূপতির মনে, চোখে স্ত্রীর সেই হাসিই গেঁথে রয়েছে। সেই হাসিকে অমলিন রাখতেই স্ত্রীর মুখমণ্ডলের অবয়ব তৈরি করেছেন তিনি। স্ত্রীর পাশে বসে থাকেন তিনি। পাশাপাশি ওই মূর্তির দিকেও চেয়ে থাকেন। পুরনো দিন আর ফিরে আসবে না, সেকথা জানেন ভূপতি। স্ত্রী শারীরিক সমস্যা কাটিয়ে ফের হাঁটাচলা করুক, এমনই চাইছেন বৃদ্ধ।