হালকা বেগুনি দেওয়াল, তার উপরে দেব দেবীর মূর্তি খোদাই করা। সদ্য রঙের প্রলেপে মন্দিরে আধুনিকত্বের ছোঁয়া থাকলেও যার প্রতিটি ইটে গাঁথা আছে কয়েকশো বছরের ইতিহাস। বোনা আছে আশ্চর্য কিছু কাহিনি। দুর্গাপুরের বন্দ্যোপাধ্যায়দের এই বাড়িই সাড়ে তিনশোর বছর ধরে বয়ে আনছে পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য।
সপ্তমী থেকেই শুরু হয় ছাগ বলি। আর হরগৌরীর বিসর্জন হয় ১২ বছর অন্তর। সঙ্গে রয়েছে প্রাচীন কলা বউ পুজোর রীতি। সাড়ে ৩৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এমনই নানা প্রাচীন আচার-অনুষ্ঠানকে ঘিরে দুর্গাপুজোর সময় বাড়তি উন্মাদনায় মেতে ওঠে কাঁকসার রাজ কুসুম এলাকার বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়ি। এই পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হরগৌরীর আরাধনা। শিব-পার্বতীর রূপ হরগৌরীকে এখানে বিশেষ নিয়ম-রীতি মেনে পুজো করা হয়। তবে সাধারণ দেবদেবীর মতো প্রতি বছর তাঁদের বিসর্জন দেওয়া হয় না। পরিবারের প্রাচীন রীতি অনুযায়ী, ১২ বছর অন্তর হরগৌরীর বিসর্জন হয়। শতাব্দীপ্রাচীন এই প্রথা আজও পরিবারের পুজোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আচার। পরিবারের দাবি, একসময় দুর্গাপুজোর প্রায় ১৫ দিন আগে থেকেই কলা বউ পুজো শুরু হয়ে যেত। সময়ের সঙ্গে পুজোর ধরন ও আচার-অনুষ্ঠানে কিছু পরিবর্তন এলেও সেই ঐতিহ্যের স্মৃতি এখনও ধরে রেখেছে পরিবার। একাদশীর দিন কলা বউয়ের বিসর্জন দেওয়া হয়। তবে এই পুজোর ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক আশ্চর্য লোককথাও।
প্রায় সাড়ে ৩৫০ বছর আগে এলাকার একটি পুকুরপাড় থেকে এক মেয়ে উঠে এসে এক শাঁখাওয়ালাকে শাঁখা পরিয়ে দেওয়ার কথা বলে। শাঁখাওয়ালা তাঁর হাতে শাঁখা পরিয়ে দেন। এরপর শাঁখার দাম চাইতে গেলে ওই মেয়ে তাঁকে বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়িতে গিয়ে টাকা নিয়ে আসতে বলে। শাঁখাওয়ালা বাড়িতে গিয়ে বিষয়টি জানালে তাঁকে বলা হয়, মন্দিরের কুলুঙ্গায় শাঁখার দাম দেওয়ার জন্য টাকা রাখা রয়েছে। শাঁখাওয়ালা মন্দিরের কুলুঙ্গায় গিয়ে সত্যিই সেখানে টাকা দেখতে পান। এই ঘটনায় বিস্মিত হয়ে যান পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের বিশ্বাস, ওই মেয়ের রূপ ধরে মা স্বয়ং তাঁদের কাছে এসেছিলেন। সেই ঘটনার পর থেকেই শুরু হয় হরগৌরীর পুজো। পরিবারের সদস্য সুখেন মুখোপাধ্যায় বলেন, “আমরা শুনেছি, এই পুজো সেই সময় থেকেই শুরু হয়েছিল। তখন কোনও মন্দির ছিল না। তখন কলা বউ পুজো ১৫ দিন আগে থেকেই করা হতো। এখনও সপ্তমী থেকে বলি শুরু হয়। একাদশীর দিন বিসর্জন হয়। এছাড়াও হরগৌরী রয়েছে শিব-পার্বতীর রূপ। তাঁদের বিসর্জন প্রত্যেক ১২ বছর পর পর করা হয়।”