• বাড়ির ইট, জানলা-দরজা খুলে নিয়ে অন্যত্র যাচ্ছেন ‘বিপন্ন’ মানুষ, বুক ফাটা কান্না ভূতনিতে!
    প্রতিদিন | ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ঝপাৎ করে মুলিরাম টোলার বড় বাড়িটা গঙ্গার গর্ভে তলিয়ে গেল। কান্নায় ভেঙে পড়লেন নিবারণ মণ্ডল। কোমর সমান জলে দাঁড়িয়ে ঈশ্বরকে ডাকছিলেন তিনি। কিন্তু শেষরক্ষা হল না। আপাতত সান্ত্বনা জানানোর মতো কেউ নেই তল্লাটে। প্রত্যেকে বিপন্ন বানভাসি। গ্রামজুড়ে বাড়ি ভাঙার ব্যস্ততা। শ্রমিক মিলছে না। বেশ কিছু জায়গায় জলবন্দি মানুষকে উদ্ধারে সেনাও হাত লাগিয়েছে।  

    গঙ্গার জলে টান ধরতে ভাঙনের তাণ্ডবে দিশাহারা রাজ্যে গঙ্গার দ্বিতীয় বৃহত্তম চর ভূতনির বাসিন্দারা। গঙ্গা, ফুলহার ও কোশি তিন নদী ঘেরা এই চর। কয়েক বছর কোশি নদীতে ভাঙন হয়নি। কিন্তু এবার সেখানেও অন্তত ৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ব্যাপক ভাঙন শুরু হয়েছে। সাতটি গ্রাম ধীরে ধীরে নদীগর্ভে তলিয়ে হারিয়ে যেতে বসেছে। সর্বস্ব খুইয়ে ফেলার আগেই বাড়ির ইট, কাঠের দরজা, জানলা খুলে নিয়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন নদীপাড়ের বাসিন্দারা। 

    এদিকে জলে তলিয়ে পথঘাট। পরিবহন বলতে হয়েছে নৌকা এবং টিনের তৈরি ডোঙ্গা। নৌকা না পেলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ডোঙ্গায় পারাপার চলছে। বানভাসি কালিয়াচক-৩ নম্বর ব্লকের ছয়টি অঞ্চলে অন্তত দু’শো গ্রাম ভেসেছে। মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পারদেওনাপুর শোভা পুর গ্রাম পঞ্চায়েতের বিস্তীর্ণ এলাকা। রাস্তার উপর দিয়ে বইছে জলে তীক্ষ্ণ স্রোত। যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন। প্রায় ২০ দিন থেকে জলমন্দি এলাকা। রবিবার নৌকায় সেখানে যান রাজ্যের সেচদপ্তরের ও আদিবাসী উন্নয়ন দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী জুয়েল মুর্মু। সঙ্গে ছিলেন বৈষ্ণবনগর বিধানসভার বিধায়ক রাজু কর্মকার, বিজেপির দক্ষিণ মালদা সাংগঠনিক জেলা সভাপতি অজয় গঙ্গোপাধ্যায়, কালিয়াচক-৩ ব্লকের বিডিও, বৈষ্ণবনগর থানার আইসি এবং সেচ দপ্তরের আধিকারিকরা।

    মন্ত্রী জুয়েল মুর্মু বলেন, “এলাকা পুরোপুরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সরকারি নৌকা এবং বানভাসিদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।” এদিনই নৌকায় ভূতনি এলাকা ঘুরে দেখেন দক্ষিণ মালদহের কংগ্রেস সাংসদ ইশা খান চৌধুরী। অন্যদিকে গর্ভবতী এবং রোগীদের নিরাপদে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে সিভিল ডিফেন্স। মানিকচক ব্লকের ভূতনি এলাকায় ত্রাণ ব্যবস্থাকে আরও দ্রুত, সুশৃঙ্খল ও কার্যকর করতে মালদহ জেলা প্রশাসন উত্তর চণ্ডীপুর গ্রাম পঞ্চায়েত কার্যালয়ে জোনাল রিলিফ অফিস চালু করেছে। সেখান থেকে নদী সংলগ্ন দূরবর্তী গ্রামগুলিতে দ্রুত ত্রাণ, চিকিৎসা, উদ্ধার সহায়তা ও প্রয়োজনীয় পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার কাজ চলছে।

    বুথ ও বসতি-ক্লাস্টারভিত্তিক ত্রাণ ব্যবস্থার মাধ্যমে শুকনো খাবার, ওষুধ, পশুখাদ্য, নৌকা, জেনারেটর এবং অন্যান্য জরুরি সামগ্রী স্থানীয় স্তরে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। ফলে জলবন্দি ও দুর্গত মানুষদের সহায়তার জন্য দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হবে না। মালদহের জেলাশাসক রাজনবীর সিং কাপূর জানান, সমস্ত প্রশাসনিক আধিকারিকরা প্লাবিত এলাকায় কাজ করছেন। মানুষের পাশে প্রশাসন আছে। প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, ভুতনি চর বাঁচাতে আইআইটি কানপুরের সাহায্য নিচ্ছে রাজ্য। ২৬ সেপ্টেম্বর মালদহে আসতে পারে আইআইটি কানপুরের প্রতিনিধিরা দল। ভাঙন সমস্যা রুখতে ইতিমধ্যেই সেচ দপ্তরের সঙ্গে বৈঠক করেছেন আইআইটি কানপুরের প্রতিনিধিরা।
  • Link to this news (প্রতিদিন)