এই সময়: খাতায়-কলমে লেখা আছে নাম। কিন্তু আদতে অস্তিত্ব নেই। এমন একাধিক মাদ্রাসার খোঁজ মিলল উত্তর দিনাজপুরে। ইসলামপুরের বাসিন্দারাই জানেন না এমন কোনও মাদ্রাসার কথা! সরকারি নির্দেশে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় বন্ধ হয়েছে অনেকগুলি মাদ্রাসা। সংখ্যায় শীর্ষে রয়েছে মালদা। রাজ্য সরকার অনুমোদনহীন ২৫২টি মাদ্রাসা বন্ধ করার নোটিস জারি করেছে। এর মধ্যে মালদায় রয়েছে ৪৪টি, উত্তর দিনাজপুরে ৩৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। অনুমোদন না থাকলেও, এ ক্ষেত্রে মাদ্রাসার অস্তিত্ব থাকার কথা। পড়ুয়া, শিক্ষক, পঠনপাঠনের জায়গাও থাকার কথা। কিন্তু উত্তর দিনাজপুরের ইসলামপুর ব্লকেই এমন একাধিক মাদ্রাসার খোঁজ মিলছে, যেগুলির কোনও অস্তিত্ব পাওয়া যাচ্ছে না।
গুঞ্জরিয়ায় অবস্থিত বলে সরকারি তালিকায় উল্লেখ রয়েছে 'ফজল ডারুম উলুম মাদ্রাসা'র নাম। তালিকার ২২৮ নম্বরে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু স্থানীয়দের দাবি, এই নামে কোনও মাদ্রাসার অস্তিত্ব তাঁদের জানা নেই। একই ভাবে তালিকার ২৩২ নম্বরে থাকা 'ইসলামপুর গার্লস জুনিয়র হাই মাদ্রাসা' নিয়েও ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। ঠিকানায় শুধু ইসলামপুর ব্লকের নাম রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা এবং শিক্ষা মহলের একাংশের দাবি, এই নামের কোনও মাদ্রাসার কথাও তাঁরা জানেন না।
ইসলামপুরের সিনিয়র মাদ্রাসা শিক্ষক শামিম আখতার রজভি বলেন, 'আমি ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই এলাকায় শিক্ষকতা করছি। কিন্তু ইসলামপুর গার্লস জুনিয়র হাই মাদ্রাসা বা ফজল ডারুম উলুম মাদ্রাসা নামে কোনও প্রতিষ্ঠানের কথা কখনও শুনিনি। কোথায় রয়েছে, সেটাও জানি না।' স্থানীয় বাসিন্দা তথা শিক্ষক তনবি ওয়াসিম আকরাম বলেন, 'আমাদের এলাকায় অনেক পুরোনো কয়েকটি মাদ্রাসা আছে। আমার পরিচিত অনেকের ছেলেমেয়ে পড়াশোনা করে। কিন্তু এই দু'টি মাদ্রাসার নাম আমিও প্রথম শুনলাম।'
২৫২টি মাদ্রাসার মধ্যে মালদায় বন্ধের তালিকায় রয়েছে ৪৪টি। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন কালিয়াচক, বৈষ্ণবনগর এবং বিহার লাগোয়া হরিশ্চন্দ্রপুর-সহ বেশ কিছু এলাকায় থাকা বেসরকারি মাদ্রাসাগুলি নিয়ে প্রশাসনের উদ্বেগ ছিল। বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখে এই এলাকাগুলির অন্তত ৪৪টি মাদ্রাসা বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুলিশ-প্রশাসন সূত্রে দাবি, কিছু প্রতিষ্ঠানে সে ভাবে পঠনপাঠনই হতো না। কালিয়াচক থানার শাহবাজপুর বিসিডি মাদ্রাসার শিক্ষক মঈনুদ্দিন হক বলেন, 'এতদিন তো ঠিকঠাক করেই ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করানো হচ্ছিল। যতটুকু সাম্মানিক মিলছিল, তাতে চলে যাচ্ছিল। কিন্তু এখন মাদ্রাসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা শুনছি। তাতেই বিকল্প কাজ জোগাড় করা নিয়ে দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে।'
সরকারি তালিকায় আলিপুরদুয়ারের চারটি মাদ্রাসা রয়েছে। জসিমন বেওয়া জুনিয়র হাই মাদ্রাসা, কলাবাড়ি মাদ্রাসা এমএসকে, কালু সাহেব জুনিয়র মাদ্রাসা ও নেফাজুদ্দিন স্মৃতি এসআর মাদ্রাসা। এর মধ্যে আলিপুরদুয়ার-১ ব্লকের শিলবাড়িহাটে মসজিদের পাশে একটি বাড়িতে মাদ্রাসা চলছে। স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, খাতায়-কলমে পড়ুয়া অনেক দেখানো হলেও আদতে সংখ্যা নগণ্য। এই ব্লকেই বাকি তিনটি মাদ্রাসা। মাদ্রাসাগুলি নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন রয়েছে। ভেলুকডাবড়িতে অনুমোদনহীন মাদ্রাসার কথা বলা হলেও সেটির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
জলপাইগুড়ি শহর সংলগ্ন খড়িয়া গ্রামপঞ্চায়েতের পাড়াপাড়া কালিবাড়ি এলাকায় বিশ্বাসপাড়াতে অনেকদিন ধরে চলছিল চিতা রায় জুনিয়র হাই মাদ্রাসা। এর পাশাপাশি বন্ধ হয়ে গেল ধাপগঞ্জ এলাকার সদানন্দপাড়া দেব জুনিয়র হাই মাদ্রাসা। কোচবিহারের ন'টি মাদ্রাসা নিয়ে জেলা সংখ্যালঘু দপ্তর রিপোর্ট পাঠিয়েছে। দপ্তরের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, সরকারি নির্দেশ মতো সব কিছু খতিয়ে দেখে বিস্তারিত তথ্য পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। মাথাভাঙা হাই মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক আব্দুল বাতেন আলি বলেন, 'যে সব মাদ্রাসার অস্তিত্ব নেই, কোনও পড়ুয়া নেই, সে সব মাদ্রাসার বিরুদ্ধে সরকার যে ব্যবস্থা নিচ্ছে, তাকে আমরা অবশ্যই স্বাগত জানাই।'
দক্ষিণ দিনাজপুরের গঙ্গারামপুরে দু'টি মাদ্রাসা বন্ধ করে দিল রাজ্যের সংখ্যালঘু বিষয়ক দপ্তর। জানা গিয়েছে, বন্ধ হওয়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দু'টির মধ্যে রয়েছে প্রাণসাগর মির্জাপুর আল-আমিন মিশন এবং ফুলবাড়ি শিবপুর জুনিয়র মাদ্রাসা। সরকারি অনুমোদন ছাড়াই এই দুই প্রতিষ্ঠানে পঠনপাঠন চলছিল বলে অভিযোগ। কেন এত বছর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, সেই প্রশ্নও উঠেছে।