ফের অশান্ত মণিপুর। তামেংলং জেলায় কুকি অধ্যুষিত দুই গ্রামে পৃথক হামলায় মৃত্যু হলো চার গ্রামবাসীর। তাঁরা কুকি-জো সম্প্রদায়ের। মৃতদের মধ্যে রয়েছেন দুই মহিলা। গুরুতর জখম হয়েছে একটি শিশুও। রবিবার মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তোলেন এবং লংপি গ্রামে এই হামলা হয়। দু’টি ঘটনাতেই হামলাকারীরা ছিল সশস্ত্র এবং তাদের পরিচয় এখনও জানা যায়নি। তবে কুকি সংগঠনগুলির অভিযোগ, নাগা সশস্ত্র নাগা সম্প্রদায়ের লোকজনই এই হামলার পিছনে রয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রথম হামলাটি হয় রবিবার ভোররাতে তোলেন গ্রামে। অভিযোগ, সশস্ত্র হামলাকারীরা একটি বাড়িতে ঢুকে গুলি চালায়। হামলায় লিংজাংগাই সিংসিত, তাঁর স্বামী সেনেহ সিংসিত এবং তাঁদের ছ’বছরের ছেলে গুলিবিদ্ধ হন। দম্পতির অবস্থা আশঙ্কাজনক ছিল। অসম রাইফেলসের কাইমাই ঘাঁটির জওয়ানরা আহতদের উদ্ধার করে জিরিবামে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যান। পরে হাসপাতালে মৃত্যু হয় লিংজাংগাই-র। তিনি গর্ভবতী ছিলেন। পরে তাঁর স্বামীও প্রাণ হারান। গুরুতর জখম অবস্থায় চিকিৎসাধীন তাঁদের ছেলে।
এর কয়েক ঘণ্টা পরে হামলা হয় লংপি গ্রামে। দুপুর ৩টে নাগাদ তিন গ্রামবাসী নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। সেই সময়ে তাঁদের লক্ষ্য করে গুলি চালায় সশস্ত্র দুষ্কৃতীরা। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় জুলি সিংসন ও থাংভেল (রোয়েল) গ্যাংটের। তৃতীয় এক মহিলা এখনও নিখোঁজ বলে খবর। স্থানীয় সংগঠনের দাবি, হামলার পর দুষ্কৃতীরা গ্রামের ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করলেও বাসিন্দাদের প্রতিরোধের মুখে পিছিয়ে যায়।
এই জোড়া হামলা ঘিরে কুকি সংগঠনগুলির অভিযোগ, এর পিছনে নাগা সশস্ত্র গোষ্ঠী NSCN(IM) এবং ZUF-এর হাত রয়েছে। যদিও সেই অভিযোগের পক্ষে এখনও তথ্যপ্রমাণ মেলেনি। তদন্তকারীরা হামলাকারীদের পরিচয় জানার চেষ্টা করছেন। কাইমাই নাগা ভিলেজ অথরিটিও ঘটনার নিন্দা করেছে। তাদের বক্তব্য, হামলাকারীরা কোনও অজ্ঞাতপরিচয় সশস্ত্র গোষ্ঠী। এই ধরনের ঘটনা দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে নতুন করে সন্দেহ ও বিভাজন তৈরি করতে পারে বলেও সতর্ক করেছে তারা।
ঘটনার সময়েও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ১৩ সেপ্টেম্বর কুকি সম্প্রদায়ের কাছে ‘ব্ল্যাক ডে’। ১৯৯০-এর দশকের কুকি-নাগা সংঘর্ষে নিহতদের স্মরণে দিনটি পালন করা হয়। সেই দিনেই দুই কুকি-জো সম্প্রদায়ের বসতিতে হামলা এবং চারজনের মৃত্যু ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে।
বিশেষ করে ইম্ফল-জিরিবাম সংযোগকারী NH-37-এর কাছে তোলেনের অবস্থান হওয়ায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কুকি নাগরিক সংগঠনগুলি অবিলম্বে নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছে। দোষীদের চিহ্নিত করে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি উঠেছে। পাশাপাশি নাগা নেতৃত্বও সব পক্ষকে সংযত থাকার আবেদন করেছে।
২০২৩ সাল থেকে মণিপুরে মেইতেই-কুকি সংঘর্ষের জেরে দীর্ঘদিন ধরেই অশান্ত পরিস্থিতি। তার মধ্যেই কুকি-নাগা এলাকায় নতুন করে এই রক্তপাত পরিস্থিতিকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলেছে। এখন প্রশাসনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ—হামলার নেপথ্যে কারা, তা দ্রুত খুঁজে বের করা এবং এই হত্যাকাণ্ডের পর প্রতিশোধমূলক হিংসা যাতে ছড়িয়ে না পড়ে, তা নিশ্চিত করা।