• রক্ত কীসের! বাইকের বস্তা খুলতেই মিলল লাশ
    এই সময় | ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • প্রশান্ত পাল ও সঞ্চিতা মুখোপাধ্যায়, পুরুলিয়া

    লাল রঙের একটি মোটরবাইক। তাতে এক যুবক। বাইকের পিছনে একটি বস্তা। এবং নৃশংস একটি খুনের ঘটনার যেন সাধ করে পুলিশের সামনে এসে পড়া।

    পুরুলিয়া শহরের দিক থেকে বলরামপুরে ঢোকার মুখে ১৮ নম্বর জাতীয় সড়কে বিদ্যুতের সাব স্টেশনের কাছে নাকা তল্লাশি চালাচ্ছিল বলরামপুর থানার পুলিশ। পর পর থামানো হচ্ছিল গাড়ি, ট্রাক, মোটরবাইক। শনিবার রাত প্রায় সাড়ে ১২টা। পুরুলিয়া শহরের দিক থেকে আসা একটি লাল মোটরবাইক থামল সেখানে। মোটরবাইকের পিছনে ইউএসবি কেবল বা চার্জারের তার দিয়ে বাঁধা সাদা রঙের একটি প্লাস্টিকের বস্তা। কৃষিপ্রধানএলাকায় মোটরবাইকের পিছনে এ রকম বস্তা চেনা ছবি। কিন্তু হঠাৎই পুলিশকর্মী ও অফিসারদের নজরে পড়ল, বস্তার এক জায়গা থেকে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত পড়ছে।

    মোটরবাইক সওয়ারি যুবককেই ওই বস্তা খুলতে বলা হলো। বস্তা খোলার পরে চোখ কার্যত কপালে উঠল পুলিশকর্মীদের। বস্তায় এক রক্তাক্ত তরুণী। নিথর। তাঁর গলার বাঁ দিকে গভীর ক্ষতচিহ্ন। ওই যুবক কিছুটা নির্বিকার ভাবেই জানালেন, ওই তরুণী তাঁর প্রেমিকা, যাঁকে তিনি খুন করেছেন। সঙ্গে সঙ্গে ওই যুবককে আটক করে সংজ্ঞাহীন তরুণীকে দ্রুত নিয়ে যাওয়া হলো স্থানীয় গ্রামীণ হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করলেন।

    বলরামপুর থানার পুলিশ প্রাথমিক ভাবে জানল, নিহত ১৯ বছরের ওই তরুণীর বাড়ি বাঘমুন্ডি থানা এলাকার একটি গ্রামে। বছর বাইশের ওই যুবকের নাম অমিত মাহাতো। তাঁর বাড়ি বাঘমুন্ডি থানা এলাকারই অন্য একটি গ্রামে। চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য দু’জনই থাকতেন পুরুলিয়া শহর লাগোয়া টামনা থানা এলাকার দু’টি আলাদা মেসে। পুলিশের বক্তব্য, শনিবার বিকেল সাড়ে ৪টের কিছু পরে অমিতের মেসে ওই তরুণী আসেন। সেখানে দু’জনের মধ্যে প্রথমে বচসা হয়। বিবাদ তুঙ্গে উঠলে বিকেল সাড়ে ৫টা নাগাদ প্রেমিকার গলায় ধারালো অস্ত্রের কোপ দেন অমিত, মৃত্যু নিশ্চিত করতে গলায় গামছা পেঁচিয়ে প্রেমিকার শ্বাসরোধও করেন তিনি।

    পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, ওই তরুণীর সঙ্গে বছর তিনেক যাবৎ অমিতের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। সম্প্রতি অমিত সন্দেহ করছিলেন যে, তাঁর প্রেমিকা অন্য কারও সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছেন। এ নিয়ে দু’জনের টানাপড়েনও চলছিল। পুরুলিয়ার পুলিশ সুপার কুমার সানি রাজ জানাচ্ছেন, প্রাথমিক তদন্তে যা উঠে এসেছে, তাতে মনে হচ্ছে, প্রেমের সম্পর্কের কারণেই এই খুনের ঘটনা ঘটেছে। তবে ওই তরুণীর বাড়ির লোকজনের দাবি, তাঁদের মেয়েকে ধর্ষণ করা হয়েছে এবং ওই ঘটনায় অমিত ছাড়া এক বা একাধিক লোক জড়িত। বলরামপুর থানায় দায়ের করা অভিযোগপত্রেও ওই তরুণীর বাবা তাঁর মেয়েকে ধর্ষণ ও খুন করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন।

    পুলিশ আপাতত খুন ও তথ্যপ্রমাণ লোপাটের অভিযোগে মামলা রুজু হয়েছে। তদন্তকারীদের বক্তব্য, ময়না–তদন্ত রিপোর্টে যদি জানা যায়, ওই তরুণীকে ধর্ষণ করা হয়েছিল, তা হলে পরে ওই ধারা যোগ করা হবে। পুরুলিয়া দেবেন মাহাতো মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ওই তরুণীর দেহ ময়না–তদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। অমিতের কাছ থেকে পুলিশ বাজেয়াপ্ত করেছে দু’টি মোবাইল ফোন, যার একটি অমিতের, অন্যটি তাঁর প্রেমিকার।

    শনিবার মধ্যরাতে অমিতকে যেখানে তাঁর প্রেমিকার বস্তাবন্দি দেহ সমেত ধরা হয়, সেই জায়গা থেকে টামনা থানা এলাকায় খুনের ঘটনাস্থলের দূরত্ব প্রায় ২৫ কিলোমিটার। মধ্যরাতে অমিত মোটরবাইকে করে যখন তাঁর প্রেমিকার দেহ লোপাট করতে যাচ্ছিলেন, তার কয়েক ঘণ্টা আগেই তাঁদের দু’জনের খোঁজ শুরু করে টামনা থানা।

    পুলিশ সূত্রের খবর, শনিবার বিকেলের দিকে মেস ফাঁকা থাকবে বলে জানিয়ে অমিত তাঁর প্রেমিকাকে সেখানে ডাকেন। সেই সময়ে মেসের অন্যরা গিয়েছিলেন ফুটবল খেলতে। অমিতের মেস থেকে তাঁর প্রেমিকার মেসের দূরত্ব মেরেকেটে দেড় কিলোমিটার। বিকেল সাড়ে ৪টের কিছু পরে অমিতের মেসে পৌঁছন ওই তরুণী এবং বিকেল সাড়ে ৫টা নাগাদ তিনি খুন হন।

    প্রেমিকার দেহ বস্তাবন্দি করে মোটরবাইকের পিছনে বেঁধে অমিত যখন মেস থেকে বেরোন, তখনও সন্ধে সাড়ে ৬টা বাজেনি। সন্ধেয় মেয়ের মোবাইল ফোনে বার বার ফোন করেও সুইচ্‌ড অফ পেয়ে ওই তরুণীর বাবা দুশ্চিন্তায় পড়েন এবং তিনি মেস কর্তৃপক্ষকে ফোন করে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করতে অনুরোধ জানান। ততক্ষণে টামনা থানার পুলিশের কাছে খবর আসে যে, এলাকার একটি মেসে সিঁড়িতে রক্তের দাগ পাওয়া গিয়েছে, মেসের এক জন আবাসিক যুবকের খোঁজ মিলছে না। সেই আবাসিকের ঘর থেকে উগ্র গন্ধ বেরোচ্ছে। টামনা থানার পুলিশ ওই মেসে পৌঁছয়। প্রাথমিক তদন্তে মনে করা হচ্ছে, নিহত তরুণীর রক্ত ধোয়ার পরে ফিনাইল বা ওই ধরনের কিছু দিয়ে মেঝে ধোয়া হয়েছিল। উগ্র গন্ধের কারণ সেটাই।

    ওই তরুণীর বাবা মেয়ের খোঁজ পেতে বাড়ির লোকজনের সঙ্গে বাঘমুন্ডি থেকে প্রথমে পৌঁছন পুরুলিয়া টাউন থানায়। তাঁদের জানা ছিল না, মেয়ে যে মেসে থাকেন, সেটা টামনা থানা এলাকায়। শনিবার মধ্যরাতে পুরুলিয়া টাউন থানাতেই ওই তরুণীর বাবা জানতে পারেন তাঁর মেয়ের ভয়ঙ্কর পরিণতির কথা।

  • Link to this news (এই সময়)