• এক ডোজ়েই কাজ, সামনের বছরই বাজারে ডেঙ্গির টিকা?
    এই সময় | ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • এই সময়: ডেঙ্গি প্রতিরোধে বাজারে টিকা আসার অপেক্ষা দীর্ঘদিনের। সেই অপেক্ষার অবসান হতে চলেছে বলে রবিবার কলকাতায় জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় চিকিৎসা-গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চ (আইসিএমআর)-এর মহানিদর্শেক (ডিজি) রাজীব বেহল। আগামী বছর ডেঙ্গির মরশুম বাড়াবাড়ি রকম শুরুর আগেই, অর্থাৎ অগস্ট-সেপ্টেম্বর নাগাদই দেশে ডেঙ্গির টিকা বাজারে আসতে পারে বলে জানান তিনি। তবে টিকা বাজারজাত করার আগে তৃতীয় দফার ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফলাফল এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন গুরুত্বপূর্ণ বলেও মন্তব্য তাঁর।

    এ দিন শহরে ‘লিভার ফাউন্ডেশন’ আয়োজিত ‘দিলীপ মহলানবীশ স্মারক বক্তৃতা’য় প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত হয়েছিলেন রাজীব। সেখানেই বক্তৃতা শেষে সাংবাদিকদের তিনি জানান, প্রস্তাবিত ডেঙ্গি টিকার ইতিমধ্যেই দ্বিতীয় দফার ট্রায়াল সম্পন্ন হয়েছে। সেই ট্রায়ালের রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, প্রাথমিক ফলাফলে এই টিকা ‘অনেকটাই ভালো’ কাজ করছে। তবে তৃতীয় দফার ট্রায়াল এখন চলছে। এই পর্যায়ে টিকার কার্যকারিতা ও সুরক্ষা সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া হবে। তৃতীয় দফার ট্রায়াল পুরো শেষ হতে এখনও কিছুটা সময় লাগবে। সেই রিপোর্টও ইতিবাচক হলে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রয়োজনীয় অনুমোদন মিললে আগামী বছরই হয়তো ডেঙ্গির টিকা বাজারে চলে আসবে।

    সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে আইসিএমআর এবং প্যানাসিয়া বায়াটেকের তৈরি ‘ডেঙ্গিঅল’ নামের এই টিকাটি ডেঙ্গির চার ধরনের ভাইরাসের (ডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩, ডেন-৪) বিরুদ্ধেই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে তৈরি। একে বলা হয় দুর্বল করা জীবন্ত ভাইরাস-ভিত্তিক টিকা (টেট্রাভ্যালেন্ট লাইভ-অ্যাটেনুয়েটেড)। ২০২৪-এ দেশের ১৯টি কেন্দ্রে ১০,৩৩৫ জনকে নিয়ে এর তৃতীয় পর্যায়ের দীর্ঘ ট্রায়াল প্রক্রিয়া শুরু হয়। টিকাটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য, এটিকে এক ডোজে়র টিকা হিসেবে তৈরি করা হচ্ছে। অচিরেই সেই তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়াল শেষে হবে। তার পর তৈরি হবে সেই ট্রায়ালের রিপোর্ট।

    আইসিএমআর ডিজি-র আশা, সেই ট্রায়ালের বিস্তারিত রিপোর্ট আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানপত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পরে কেন্দ্রীয় ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা সেন্ট্রাল ড্রাগ স্ট্যান্ডার্ডস কন্ট্রোল অর্গানাইজেশন (সিডিএসসিও) থেকে অনুমোদন পেতে পেতে সামনের বছর মাঝামাঝি হয়ে যাবে। তাই বাজারে আসতে আসতে ডেঙ্গির পরবর্তী মরশুম এসেই যাবে হয়তো। যদিও অনেকের মনেই প্রশ্ন ভাসছে, বেসরকারি উদ্যোগে তৈরি ডেঙ্গির আর একটি টিকা, জাপানি সংস্থা তাকেডা-র তৈরি ‘কিউডেঙ্গা’ ইতিমধ্যেই যেখানে সিডিএসসিও-র অনুমোদন পেয়ে গিয়েছে, সেখানে সেই টিকাটিও কবে বাজারজাত হবে, সে সম্পর্কে কোনও আলোকপাত কেন করছে না কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রক?

    গত ২১ জুলাই কিউডেঙ্গা-কে ভারতে ডেঙ্গির প্রথম অনুমোদিত টিকা হিসেবে বাজারজাত করার ছাড়পত্র দিয়েছে সিডিএসসিও। ৪ থেকে ৬০ বছর বয়সিদের জন্য অনুমোদিত এই টিকা ডেঙ্গির চারটি সেরোটাইপের বিরুদ্ধেই প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরির জন্য তৈরি। তবে একটি নয়, তিন মাসের ব্যবধানে দু’টি ডোজ় নিতে হবে এই টিকার। কিন্তু কেন্দ্রীয় অনুমোদনের পরেও সেই টিকাটি চলতি ডেঙ্গির মরশুমে কেন নাগালে পেল না দেশবাসী, সেই প্রশ্ন উঠছে সাধারণের মনে। কেননা, প্রতি বছর দু’-তিন লক্ষ মানুষ ডেঙ্গিতে আক্রান্ত হন এ দেশে। কয়েকশো মানুষ মারাও যান। সেই পরিস্থিতিতেই ডেঙ্গির টিকা দ্রুত বাজারজাত হওয়ার পক্ষে সওয়াল করছেন অনেকে।

    যদিও বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পাওয়ার পরও টিকা বাজারে আসতে অনেকগুলি ধাপ পেরোতে হয়। তাতে এই সময়টা লেগেই যায়। ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বিশেষজ্ঞ স্নেহেন্দু কোনারের ব্যাখ্যা, ভারতীয় কোম্পানি বায়োলজিক্যাল ইভান্স-এর মাধ্যমে কিউডেঙ্গা-কে বাজারজাত করার ক্ষেত্রে প্রথমে প্রয়োজন আমদানি বা স্থানীয় উৎপাদনের লাইসেন্স। এর পর প্রতিটি ব্যাচের গুণমান পরীক্ষা ও ছাড়পত্র নিতে হয় কসৌলির সেন্ট্রাল ড্রাগস ল্যাবরেটরি (সিডিএল) থেকে। পাশাপাশি বেসরকারি বাজারে দাম নির্ধারণ, কোল্ড-চেন, পরিবহণ ও বণ্টন ব্যবস্থা তৈরি এবং হাসপাতাল-ক্লিনিকের সঙ্গে সমন্বয়ের কাজ চলে।

    স্বাস্থ্যকর্তারা জানাচ্ছেন, বিদেশি কোম্পানির তৈরি টিকার স্থানীয় স্তরে উৎপাদন করতে হলে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও উৎপাদন পরিকাঠামোও যাচাই করে প্রস্তুত করতে হয়। সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পরেই বাণিজ্যিক ভাবে টিকা বাজারে আনা সম্ভব। সরকারি টিকাকরণ কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি আবার পৃথক এবং আরও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। ক্লিনিক্যাল ফার্মাকোলজির বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক শান্তনু ত্রিপাঠী বলেন, ‘করোনার সময়ে জরুরি পরিস্থিতির কারণে এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ব্যতিক্রম ঘটানো হয়েছিল প্রশাসনিক স্তরে। টিকার অনুমোদন, উৎপাদন, পরীক্ষা ও সরবরাহের বিভিন্ন কাজ অনেকটাই সমান্তরাল ভাবে এগিয়েছিল অতিমারী পর্বে।’

    বিশেষজ্ঞদের দাবি, কোভিড কালে ‘জরুরি ব্যবহারের জন্য অনুমোদন’-এর বিশেষ ব্যবস্থাও চালু হয়েছিল তখন। ফলে অনুমোদন থেকে বাস্তব প্রয়োগ বা ব্যবহারের মধ্যেকার সময় কম লেগেছিল। কিউডেঙ্গা-র ক্ষেত্রে এমন জরুরি পরিস্থিতি না থাকায় স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রক ও বাণিজ্যিক ধাপই অনুসরণ করতে হচ্ছে।

  • Link to this news (এই সময়)