রূপক মজুমদার, বর্ধমান
চার বছরের শিশু অরণ্য রায়ের ফাইমোসিস (পুরুষাঙ্গের সামনের আবরণ) অপারেশনে প্রাণ যাওয়ার ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠছে চিকিৎসকদের 'প্রকৃত যোগ্যতা' নিয়ে। মর্মান্তিক সেই মৃত্যুর পরে নড়েচড়ে বসেছে জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিকের দপ্তরও।
সূত্রের খবর, পূর্ব বর্ধমানের সমস্ত বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে চিকিৎসকদের যাবতীয় তথ্য নতুন করে খতিয়ে দেখা হবে। সব তথ্য আবার দপ্তরে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাতে 'ভুয়ো চিকিৎসক' নিয়ে নতুন করে যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে, তা দূর করা সম্ভব বলে মনে করছে জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক দপ্তর।
প্রসঙ্গত ২ সেপ্টেম্বর বর্ধমানের নবাবহাট মোড়ের এক নার্সিংহোমে চার বছরের অরণ্যকে ভর্তি করা হয়েছিল ফাইমোসিস অপারেশনের জন্য। অস্ত্রোপচারের পরেই ওই শিশুর খিঁচুনি শুরু হয়। পরে তাকে আইসিইউ–য়ে নিয়ে যাওয়া হলেও প্রাণ বাঁচানো যায়নি। ওই ঘটনায় অভিযুক্ত হিসেবে উঠে আসে 'জেনেরাল সার্জন' শেখ সায়দুলের নাম। অভিযোগ, আদতে তিনি কোনওদিন মেডিক্যাল কলেজের চৌকাঠ মাড়াননি। বিহার মেডিক্যাল কলেজের ভুয়ো শংসাপত্র দেখিয়ে পশ্চিমবঙ্গ মেডিক্যাল কাউন্সিল থেকে রেজিস্ট্রেশন নম্বর নিয়ে ডাক্তারির লাইসেন্স বাগান।
এই ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। তিনি বলেন, 'আগের সরকারের সময়ে রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের যে নির্বাচন হয়েছিল, তা ছিল প্রহসন। বেছে বেছে দুর্নীতিপরায়ণ লোকজনকে নিয়োগ করা হয়েছিল স্বাস্থ্য পরিকাঠামো এবং এই ধরনের পছন্দের চিকিৎসকদের রেজিস্ট্রেশন নম্বর পাইয়ে দেওয়ার জন্য। আমরা একের পর এক সেই ভুয়ো ডাক্তারদের ধরব। তাঁদের তোলা হবে জনগণের কাঠগড়ায়। এই বিষয়ে রাজ্য সরকার বিন্দুমাত্র শিথিলতা দেখাবে না।'
ঘটনা হলো, সায়দুল–কাণ্ডের পরে বর্ধমান জুড়ে রোগী এবং তাঁর পরিজনরাও আতঙ্কে ভুগছেন। অনেকে নাকি ডাক্তার দেখাতে এসে কম্পাউন্ডার অথবা সহকারীর কাছে জানতে চাইছেন, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের আদৌ কী চিকিৎসা করার যোগ্যতা রয়েছে! বর্ধমানের খোসবাগান 'ডাক্তারপাড়া' হিসেবে পরিচিত। সম্প্রতি শহরের এক বিশিষ্ট সার্জনের সহযোগী অলোক সাহাকে পড়তে হয়েছে এমনই প্রশ্নের মুখে!
অলোক বলছেন, 'একজন রোগী এসে আমাকে ব্যক্তিগত ভাবে জিজ্ঞাসা করেন, যে ডাক্তারকে দেখাতে এসেছেন, তিনি আক্ষরিক অর্থেই চিকিৎসক তো! স্যরের সঙ্গে গত ন'বছর ধরে কাজ করছি। কিন্তু কোনওদিন এমন প্রশ্নের মুখেও যে পড়তে হবে, তা কল্পনাও করিনি।' তিনি যোগ করেন, 'যে ভাবে ভুয়ো ডাক্তারদের কাণ্ডকারখানা প্রকাশ্যে আসছে, তাতে আমরাও সমান ভাবে লজ্জিত। ফলে রোগী অথবা তাঁর পরিজনদের এহেন প্রশ্নের মুখে কী–ই বা জবাব দিতে পারি!'
এর আগে ২০১৭–তে বর্ধমানের কাটোয়ায় ধরা পড়েছিলেন এক ভুয়ো চিকিৎসক। সেই অভিযোগের তদন্ত করেছিল সিআইডি। চিকিৎসকদের ডিগ্রি যাচাই করা নিয়ে দেখা গিয়েছিল তৎপরতা। সেই সময়ে অনেক চিকিৎসক নিজস্ব চেম্বারের বাইরে লাগানো সাইনবোর্ডও খুলে নেন। কিন্তু ধীরে ধীরে বিষয়টি থিতিয়ে যায়। তদন্তের রিপোর্ট এখনও প্রকাশিত হয়নি। সবাই আচমকা নীরব হয়ে যান!
অ্যাসোসিয়েশন অফ প্রাইভেট হসপিটালস অ্যান্ড নার্সিংহোম–এর সহ–সভাপতি শেখ আব্বাসউদ্দিন বললেন, 'চিকিৎসক সম্পর্কে মানুষের মধ্যে এই যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, তাতে আমরাও উদ্বিগ্ন। আমাদের মতো যাঁরা বেসরকারি হাসপাতাল চালান, তাঁদের মধ্যেও তো এখন একটা চাপা অস্বস্তি এবং নানা ধরনের প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।'
আব্বাসউদ্দিন যোগ করেন, 'আমরা তো পোর্টাল খুলে ডাক্তারদের সমস্ত নথিপত্র খতিয়ে দেখি। রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিল কী ভাবে এঁদের মান্যতা দিয়েছিল, সেই প্রশ্ন তো আমরাও করছি।। স্বাস্থ্যসাথী পোর্টালে এঁদের নাম জ্বলজ্বল করছে। আমি মনে করি, মেডিক্যাল কাউন্সিলে বসে যাঁরা এই ভুয়ো রেজিস্ট্রেশন নম্বর দিয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে সরকার আগে ব্যবস্থা নিক।'
জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক জয়রাম হেমব্রম বলেন, 'আমরা কঠোর মনোভাব নিয়েই এগোচ্ছি। তদন্ত চলছে। এখনই এর থেকে বেশি কিছু বলা সম্ভব নয়।'