• ‘কাচের গ্লাসে চা, মাছের ল্যাজার ঝাল…’, জগৎবল্লভপুরে শুটিংয়ের দিনে আর কী কী খেতেন মহানায়ক?
    এই সময় | ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • হাওড়ার জগৎবল্লভপুরের গোহালপোতা গ্রাম। সেখানকার খাঁ বাড়ির দোতলার পশ্চিম দিকের ঘরে অলস দুপুরে বিশ্রাম নিচ্ছেন বাঙালির চিরন্তন ম্যাটিনি আইডল মহানায়ক উত্তম কুমার। লাঞ্চের সময় হতেই কাঁসার থালায় চারটে গরম রুটি, টাটকা রুই মাছের পাতলা ঝোল আর মুচমুচে পটল ভাজা নিয়ে ঘরে ঢুকলেন খাঁ বাড়ির পুত্রবধূ মৃদুলা। কিন্তু থালার দিকে চোখ পড়তেই মিষ্টি হেসে বাধা দিলেন পাশে বসে থাকা সুপ্রিয়া দেবী। মৃদুলা কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। তাঁকে থামিয়ে সুপ্রিয়া তিনি বলে উঠলেন, ‘আজ যে বৃহস্পতিবার... দাদা আজ ভাত খাবেন, রুটি নয়!’

    পর্দায় যিনি অপ্রতিরোধ্য ম্যাটিনি আইডল, বাস্তব জীবনের আলো-আঁধারিতে তিনি বড্ড নিভৃতচারী, নিতান্ত সাধারণ। হাওড়ার জগৎবল্লভপুরের গোহালপোতা গ্রাম আজও বহন করে চলেছে সেই সাদা-কালো সোনালি যুগের পদচিহ্ন। সত্যনারায়ণ খাঁর ঐতিহাসিক বাড়ি আর ‘চণ্ডীমাতা ফিল্মস’-এর টানেই বার বার এই গ্রামে ছুটে যেতেন উত্তম কুমার।

    ‘ধন্যি মেয়ে’, ‘সন্ন্যাসী রাজা’, ‘হার মানা হার’ কিংবা ‘কমললতা’-র মতো কালজয়ী ছবির শুটিং চলাকালীন খাঁ বাড়িই হয়ে উঠত মহানায়কের ‘সেকেন্ড হোম’। কিন্তু শুটিংয়ের ব্যস্ততা আর হাজার হাজার মানুষের উত্তাল উন্মাদনার মাঝে খাঁ বাড়ির অন্দরে কেমন ছিল উত্তম কুমারের দৈনন্দিন জীবন? কেমন ছিল তাঁর ঘরোয়া খাদ্যাভ্যাস?

    খাঁ বাড়ির প্রবীণ পুত্রবধূ মৃদুলা আজও স্পষ্ট মনে করতে পারেন সেই দিনগুলোর কথা। ১৯৭০ সালে বিয়ের পরে প্রথমবার এই বাড়িতেই মহানায়ককে সামনাসামনি দেখেন তিনি। তাঁর স্মৃতিতে ফুটে ওঠে এক অন্য উত্তম কুমার। সিলভার স্ক্রিনের তারকা ইমেজ ঝেড়ে ফেলে খাঁ বাড়িতে যিনি ছিলেন একবারে ঘরের মানুষ।

    অভিনয়ের বাইরে খাওয়া-দাওয়া নিয়ে বিন্দুমাত্র তারকাসুলভ বায়না ছিল না তাঁর। মৃদুলা খাঁ বলেন, ‘ম্যাটিনি আইডলের দিন শুরু হতো এক কাপ চা আর দু’টো ক্রিম ক্র্যাকার বিস্কুট দিয়ে। চা খেতে ভালোবাসতেন কাঁচের গ্লাসে, কোনও কাপ-প্লেটে নয়, একেবারে খাঁটি বাঙালি আড্ডার মেজাজে।’

    ব্রেকফাস্টও ছিল ছিমছাম। সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার দিকে খেতেন এক পিস পাউরুটি আর একটা মিষ্টি। সঙ্গে কোনও কোনও দিন এক কাপ চা, আবার মাঝেমধ্যে হরলিক্স।

    দুপুরেও থাকত না কোনও অতি আড়ম্বর। একদম সাদামাটা ঘরোয়া খাবার খেতেই পছন্দ করতেন উত্তম কুমার। শুটিং শেষ করে এসে দুপুরে খেতেন হাতে গড়া নরম রুটি। মৃদুলা খাঁ নিজের হাতে চারখানা রুটি তৈরি করে দিতেন মহানায়কের জন্য। সঙ্গে পাতলা করে রান্না করা টাটকা মাছের ঝোল আর মুচমুচে পটল ভাজা। কখনও আবার থাকত মাছের ল্যাজের ঝাল।

    ‘বনপলাশীর পদাবলী’ ছবির শুটিং চলাকালীন স্বয়ং সুপ্রিয়া দেবী নিজের হাতে মহানায়ককে রান্না করে খাইয়েছিলেন এই মাছের ল্যাজের ঝাল। চিংড়ি মাছ খেতেও ভীষণ ভালোবাসতেন উত্তম কুমার। মহানায়কের সেই পছন্দের কথা মাথায় রেখে সত্যনারায়ণ খাঁ বিশেষ করে কানাদামোদর নদী থেকে তাজা চিংড়ি আনিয়ে খাইয়েছিলেন তাঁকে, জানালেন মৃদুলা।

    তবে সপ্তাহের অন্য দিন দুপুরে রুটি চললেও, একটি নির্দিষ্ট দিনে কিন্তু ভাত না হলে একেবারেই চলত না মহানায়কের। এ কথা মৃদুলা খাঁ জানতে পেরেছিলেন সুপ্রিয়া দেবীর কাছ থেকেই। স্মৃতিচারণ করলেন মৃদুলা, ‘বনপলাশীর শুটিং চলাকালীন প্রতিদিনের অভ্যাসবশত রুটি নিয়েই যাই উত্তমবাবুকে দেব বলে। কিন্তু সেই দিন ছিল বৃহস্পতিবার। খাবার নিয়ে যেতেই সুপ্রিয়া দেবী জানান, আজ বৃহস্পতিবার, দাদা আজ ভাত খান।’ তা জানার পর থেকে সেই নিয়ম অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলা হতো খাঁ বাড়িতে।

    রাতের খাবারের আয়োজনও ছিল ছিমছাম। চারখানা হাতে গড়া রুটি আর কচি দেশি মুরগির মাংসের ঝোল — ব্যস, আর কিছুই খেতেন না তিনি।

    এ ছাড়াও মৃদুলা খাঁ জানান, প্রথমবার যখন তাঁর উপর দায়িত্ব এল যে, রান্না করতে হবে উত্তম কুমারের জন্য, তখন তাঁর মনে একটু ভয়, আনন্দ আর তার সঙ্গে বেশ কিছুটা উদ্বেগও কাজ করছিল। মহানায়ক উত্তম কুমারের জন্য প্রথমবার রান্না করবেন! স্বাভাবিক ভাবেই মনের মধ্যে একটা চাপ তো ছিলই।

    প্রথম দিন তিনি রান্না করেছিলেন মুরগির মাংস। বেশি তেল আর মশলা... সঙ্গে পেঁয়াজ-রসুন। ভালো করে কষিয়ে রান্না করেছিলেন। কিন্তু খাবার নিয়ে হাজির হতেই সুপ্রিয়া দেবী হেসে বললেন, ‘দাদা এত তেল-ঝাল-মশলা দেওয়া খাবার খান না।’ তার পরে বললেন, ‘চলো, আমি দেখিয়ে দিচ্ছি কী ভাবে রান্না করতে হবে।’ সুপ্রিয়া দেবী নিজে হাতে রান্না করে দেখালেন মৃদুলাকে। ছোট আঁচের উনুনে অল্প আদা-লঙ্কা বেঁটে খুব হালকা করে রান্না করেছিলেন তিনি। সেই রান্না দেখে মৃদুলাও শিখে গেলেন, উত্তম কুমারের জন্য কী ভাবে রান্না করতে হবে।

    শুটিংয়ের সময় বাজারের দায়িত্বও ছিল বেশ বড় ব্যাপার। কলকাতার বড়বাজার থেকে আসত প্রয়োজনীয় জিনিস। বিরাট একটা তালিকা তৈরি হতো। ডাল থেকে মশলা। কাজু থেকে কিশমিশ। ধনে, জিরে, আদা, লঙ্কা — সংসারে যা যা প্রয়োজন, সবই থাকত সেই তালিকায়। আবার ‘বন পলাশীর পদাবলী’-র শুটিংয়ের সময়ে কলকাতা থেকে ডেকচিতে করে খাবারও এসেছিল। সেই খাবারের মধ্যে ছিল চিংড়ির পকোড়া। সুপ্রিয়া দেবী তখন মৃদুলাকে বলেছিলেন, ‘তুমি একটা খাবে?’ মৃদুলা প্রথমে রাজি হননি। তখন সুপ্রিয়া দেবী নিজেই হাতে তুলে একটা চিংড়ির পকোড়া তাঁর মুখে খাইয়ে দিয়েছিলেন। ঘটনাটা হয়তো খুব ছোট। কিন্তু সেই ছোট্ট মুহূর্তই মৃদুলার স্মৃতিতে আজও অমলিন।

    শুধু শুটিংয়ের কাজেই নয়, পারিবারিক উৎসব, দোলের রং খেলা কিংবা নিছক দু’দিনের ক্লান্তি মেটাতেও জগৎবল্লভপুরের এই নিভৃত কোণে চলে যেতেন উত্তমকুমার। বিকেলের শান্ত আলোয় পোষা কুকুরটিকে নিয়ে হেঁটে বেড়াতেন গ্রামের কাঁচা মেঠো পথ ধরে।

    আজ চণ্ডীমাতা ফিল্মসের আলো নিভেছে, খাঁ বাড়ির আনাচে-কানাচে লেগেছে ক্ষয়ের দাগ। কিন্তু দোতলার সেই বারান্দা আর চণ্ডীমণ্ডপের শান্ত হাওয়ায় আজও যেন ভেসে বেড়ায় এক অমোঘ স্মৃতি — কাচের গ্লাসে চায়ের চুমুক, কচি মুরগির ঝোল আর কানাদামোদরের চিংড়ির স্বাদে মোড়া এক মহানায়কের সাদামাটা জীবনের উষ্ণ ছোঁয়া।

  • Link to this news (এই সময়)