আজকাল ওয়েবডেস্ক: দুর্গাপুজোর শহর কলকাতায় এখন উৎসবের তালিকায় ক্রমেই জায়গা করে নিচ্ছে গণেশ চতুর্থী। একসময় মূলত ব্যবসায়ী ও মহারাষ্ট্রীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা গণেশ পুজো গত কয়েক বছরে কলকাতার বিভিন্ন পাড়া, আবাসন এবং শহরতলিতেও ছড়িয়ে পড়েছে।
১৯২৪ সালে শুরু হওয়া একটি পুজা থেকে আজকের কয়েক হাজারের বিস্তার—কলকাতায় গণেশ আরাধনার এই পরিবর্তন বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। কলকাতার প্রাচীনতম সংগঠিত গণেশ পুজাগুলির অন্যতম হল মহারাষ্ট্র মণ্ডলের পুজা। ১৯২৪ সালে হাজরা রোডে মণ্ডলের অফিসের আশপাশে ছোট পরিসরে এই পুজার সূচনা হয়। পরবর্তীতে মহারাষ্ট্র নিবাস গড়ে ওঠে। ২০২৩ সালে এই পুজা ৯৯ বছরে পা দেয় এবং ২০২৪ সালে শতবর্ষ পূর্ণ করে।
তবে গণেশ পুজোর বিস্তারের বড় পরিবর্তন দেখা গিয়েছে সাম্প্রতিক কয়েক বছরে। প্রায় এক দশক আগে কলকাতায় গণেশ পুজোর সংখ্যা ছিল আনুমানিক ১০০ থেকে ১৫০-র মধ্যে। মূলত বড়বাজার, পোস্তা, এসএন ব্যানার্জি রোড, কাঁকুড়গাছি এবং বাঙ্গুরের মতো এলাকায় এই পুজার প্রবণতা বেশি ছিল। পরে ধীরে ধীরে শহরের অন্য এলাকাতেও গণেশ পুজা শুরু হয়।
করোনা অতিমারির সময়ে অবশ্য পুজোর সংখ্যা এবং আয়োজন দু'টিই কমে যায়। ২০২০ এবং ২০২১ সালে কলকাতায় গণেশ পুজার আয়োজন ছিল অনেকটাই সীমিত। ২০২২ সালে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সঙ্গে ফের বাড়তে শুরু করে পুজার সংখ্যা। কলকাতা পুলিশ সূত্রে সে বছর শহরে প্রায় ৩৫০টি গণেশ পুজোর মণ্ডপ প্যান্ডেল হয়েছিল। ২০২৬ সালে কলকাতাতেই এই সংখ্যা প্রায় ৪০০-তে পৌঁছেছে।
কুমোরটুলির বাইরের ট্রামলাইনের উপর এ বছরে রীতিমতো মণ্ডপ তৈরি করে গণেশ মূর্তি বিক্রি হয়েছে বলে কুমোরটুলি মৃৎশিল্পী সমিতির তরফে জানানো হয়েছে। সমিতির সম্পাদক রুদ্রজিৎ পালের কথায়, “এ বছরে কুমোরটুলিতে বায়না দেওয়া প্রতিমার তুলনায় বাইরের রাজ্য থেকে ছাঁচে তৈরি করে আনা প্রতিমা এনে বিক্রির সংখ্যা অনেক বেশি।” অর্থাৎ কলকাতায় গণেশ পুজার সংখ্যা বাড়লেও তার পুরো চাহিদা যে কুমোরটুলির শিল্পীদের কাছে আসছে, এমনটা নয়। বাইরের রাজ্য থেকে তৈরি মূর্তি এনে বিক্রির প্রবণতাও বেড়েছে।
তবে বৃহত্তর কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকাকে ধরলে ছবিটা আরও বড়। ২০২২ সালে কলকাতা ও শহরতলি মিলিয়ে প্রায় ১,২৫০টি গণেশ পুজা হয়েছিল বলে বিভিন্ন তথ্যে উঠে এসেছে। ২০২৬ এ এসে এই সংখ্যা আরও প্রায় ২০ শতাংশের মতো বেড়েছে।
গণেশ পুজোর বিস্তারের সঙ্গে বদলেছে পুজোর আয়োজকদের চরিত্রও। আগে যেখানে ব্যবসায়ী সম্প্রদায় এবং নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠী মূলত এই পুজার আয়োজন করতেন, এখন বিভিন্ন পাড়ার ক্লাব, আবাসন সমিতি এবং হাউজিং কমপ্লেক্সও গণেশ পুজো হচ্ছে। বিশেষ করে শহরের নতুন আবাসনগুলিতে এই প্রবণতা চোখে পড়ছে।
গণেশকে ব্যবসা, সমৃদ্ধি ও শুভ সূচনার দেবতা হিসেবে মানার কারণে ব্যবসায়ী মহলে এই পুজোর দীর্ঘদিনের জনপ্রিয়তা রয়েছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গণেশ চতুর্থীকে ঘিরে মহারাষ্ট্রের উৎসবের প্রভাব। মুম্বইয়ের গণেশ উৎসবের জনপ্রিয়তা এ বার এসে পৌঁছেছে কলকাতাতেও । ফলে কলকাতা শহরের ভিতরেও বহু এলাকায় গণেশ পুজো এখন নিজস্ব সামাজিক উৎসবের রূপ নিচ্ছে।
২০২৫ সালে কুমোরটুলি থেকে কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকায় এক হাজারের বেশি গণেশ মূর্তি সরবরাহের কথা জানা যায়। ২০২৬ সালে কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী হাওড়া, হুগলি এবং উত্তর ২৪ পরগনা-সহ বৃহত্তর এলাকায় গণেশ পুজোর সংখ্যা প্রায় ১০ হাজারে পৌঁছেছে! অর্থাৎ, এক শতাব্দী আগে হাজরা রোডে ছোট পরিসরে শুরু হওয়া সংগঠিত গণেশ আরাধনা এখন কলকাতার বহু পাড়ার পরিচিত ছবি।
শুধু তাই নয়, কলকাতায় গণেশ পুজো আর নির্দিষ্ট কোনও সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দুর্গাপুজোর পাশাপাশি শহরের বারোযারি পুজো কমিটি থেকে শুরু করে আবাসন এবং বাড়ির উৎসবের ক্যালেন্ডারে গণেশ চতুর্থীর উপস্থিতিও ক্রমশ বাড়ছে।