• বঙ্গসন্তানের হাত ধরে গাড়ির কেবিনেই গানের আসর
    এই সময় | ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • সুদীপ্ত বন্দ্যোপাধ্যায়

    মঞ্চে উঠেই যে গান গাইতে হবে, এমন কোনও কথা নেই। গাড়িতে বসে পথ চলতে চলতেও তৈরি হতে পারে গান, একসঙ্গে কাটানো আনন্দের মুহূর্ত।

    কলকাতার সঙ্গীতপ্রেমী উদ্যোগপতি রণদীপ ভট্টাচার্যের তৈরি ভারতীয় কারাওকে ও সোশ্যাল মিউজ়িক প্ল্যাটফর্ম স্টারমঞ্চ এ বার সেই ধারণাকেই নিয়ে গেল গাড়ির কেবিনে। শুধু স্মার্টফোনের পর্দায় সীমাবদ্ধ না রেখে সদ্য বাজারে আসা এমজি হেক্টর টোমাহকে স্টারমঞ্চ কারাওকে অ্যাপ যুক্ত হওয়ায় গাড়ির ভিতরে তৈরি করা যাবে একেবারে অন্যরকম একটি সঙ্গীতের পরিবেশ। ফলে সপ্তাহান্তে পরিবারের সঙ্গে বেড়াতে বেরিয়ে একসঙ্গে গান গাওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে দিতে পুরোনো দিনের প্রিয় গান মনে করা কিংবা মাইক্রোফোন হাতে নিজের গান গাওয়ার শখ পূরণের মতো অভিজ্ঞতা সম্ভব হবে গাড়ির কেবিনেই।

    স্টারমঞ্চ-এ রয়েছে ৮,০০০-এর বেশি কারাওকে ট্র্যাক। বলিউডের জনপ্রিয় গান, ভক্তিমূলক সঙ্গীত, আঞ্চলিক ভাষার গান এবং শিশুদের উপযোগী কনটেন্ট — বিভিন্ন ধরনের গানের সম্ভার রয়েছে এই প্ল্যাটফর্মে। ব্যবহারকারীরা পছন্দের গানের সঙ্গে গলা মেলানোর পাশাপাশি নিজেদের পরিবেশনাও রেকর্ড করতে পারবেন। ফলে গাড়ির যাত্রা শুধু গান শোনার নয়, নিজেরাও সেই গানের অংশ হয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

    এই ভাবনার বীজ ১৯৮৭–তেই বোনা হয়ে গিয়েছিল। সঙ্গীতপ্রিয় নাতি রণদীপের ১৫ বছরের জন্মদিনে রেকর্ড প্লেয়ার কিনে দিয়েছিলেন দাদামশাই প্রফুল্ল কুমার চক্রবর্তী। সেই উপহার যে নাতির আগ্রহ কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেবে তা হয়তো তিনি নিজেই কল্পনা করতে পারেননি। দীর্ঘ প্রায় ৪০ বছর পরে রণদীপের হাতে জন্ম নিয়েছে দেশে তৈরি কারাওকে প্ল্যাটফর্ম — স্টারমঞ্চ-এর। কারাওকে হলো এমন একটি বিনোদনের মাধ্যম, যেখানে কোনও জনপ্রিয় গানে মূল গায়কের কণ্ঠ ছাড়াই শুধু যন্ত্রসঙ্গীত বাজে। যা ব্যবহার করে কোনও যন্ত্রশিল্পীর সাহায্য ছাড়াই যে কেউ তাঁর গান গাওয়ার শখ পূরণ করতে পারেন।

    আদতে ফিনান্স-এর ছাত্র উদ্যোগপতি রণদীপ। ২০১১-য় থাইল্যান্ডে নিজস্ব তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থা সাইটেক সলিউশনস খোলেন। এখন থাইল্যান্ড সমেত দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন ব্যাঙ্কের আর্থিক পরিষেবা সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানে নিযুক্ত তাঁর সংস্থা। কিন্তু, রক্তে যে সব সময় গানের সুর বেজে চলেছে। রণদীপের কথায়, 'আমার গান শুনে বন্ধুরাই চিনা কারাওকে প্ল্যাটফর্ম স্টারমেকার-এ গান গাইতে বলেছিল। ২০১৭ থেকে সেই প্ল্যাটফর্মে গান গাওয়া শুরুও করি। কিছুদিন পরেই স্টারমেকার, স্মিউল-এর মতো বিদেশি প্ল্যাটফর্মগুলির আদলে সম্পূর্ণ দেশি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করার কথা মাথায় আসে।'

    ২০২১-এ বেঙ্গালুরুতে তৈরি হয় স্টারমঞ্চ প্রাইভেট লিমিটেড। নিজস্ব তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার কর্মীদের দিয়ে বানানো হয় স্টারমঞ্চ অ্যাপ। ২০২২-এ যা আত্মপ্রকাশ করে। গানের লাইসেন্স রাইট কেনা থেকে শুরু করে হার্ডওয়্যার-এর ব্যবস্থা করতে নিজস্ব জমানো পুঁজি লাগিয়ে দেন নতুন 'সন্তান'-এর পিছনে। এরই মধ্যে স্টারমঞ্চ-এ চন্দ্রবিন্দু-র মতো ব্যান্ড, জয় সরকার, শ্রীজাত, মনোময় ভট্টাচার্যের মতো শিল্পীদের দিয়ে গান গাইয়ে নিয়েছেন তিনি। প্রযোজনা করেছেন ১২ মাসে ১৩ পার্বণ নামের একটি সঙ্গীতানুষ্ঠান-ও।

    এই প্ল্যাটফর্ম তৈরির আগে মার্কেট রিসার্চ সংস্থাকে দিয়ে এই ব্যবসা থেকে আয়–ব্যয়ের হিসেব বুঝে নিয়ে তবেই ভারতের প্রায় ২৫০ কোটি টাকার কারাওকে মিউজ়িক মার্কেট পা রেখেছেন তিনি। প্ল্যাটফর্মকে 'ডিভোশনাল' এবং 'নন-ডিভোশনাল'— এই দুই ভাগে ভাগও করেছেন। বেঙ্গালুরুর সত্য সাই ফাউন্ডেশনের সঙ্গে চুক্তি করে তাদের ভজনের যন্ত্রসঙ্গীত আপলোড করেন এই প্ল্যাটফর্মে। লক্ষ্য ধার্মিক ব্যক্তিদের নিজস্ব জায়গা দেওয়া। এখন রামকৃষ্ণ মিশনের সঙ্গেও আলোচনা চালাচ্ছে রণদীপের সংস্থা।

    ২০২২ থেকে স্টারমঞ্চ-এর ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়তে বাড়তে বর্তমানে ২ লক্ষ ২০ হাজারে দাঁড়িয়েছে। এই বিপুল ব্যবহারকারী দেখে স্টারমঞ্চ-এর সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করে দেশের এক টেলিকম সংস্থা। তারপরেই 'কানেক্টেড প্ল্যাটফর্ম' হিসেবে এমজি হেক্টর টোমাহক গাড়িতে আত্মপ্রকাশ এই অ্যাপের।

  • Link to this news (এই সময়)