বাবলু সাঁতরা, চন্দ্রকোণা
আধার যে তাঁকে এমন আঁধারে ফেলবে, ঘুণাক্ষরেও টের পাননি তিনি। 'কই, দেখি আপনার আধার কার্ড' শুনলেই তিনি বড় সঙ্কোচে পড়েন। তারপরে মাথাটা নিচু করে, কাঁপাকাঁপা হাতে এগিয়ে দেন আধার কার্ড। তারপরেই ছিটকে আসে, 'অ্যাঁ, আপনার বয়স ১০৬ বছর? মানে...।'
আর মানে। চন্দ্রকোণা-১ ব্লকের ডিঙাল গ্রামের কৃষ্ণা পালের তখন 'ধরণী দ্বিধা হও' অবস্থা। তারপরে ছুটে আসে একের পর এক প্রশ্নবাণ, -এত দিন কেউ বাঁচে নাকি? -এই বয়সে ভাতা কী ভাবে পাবেন, বলুন তো? -ভুলই যদি হয়ে থাকে তা হলে সংশোধন করেননি কেন? কৃষ্ণাকে নিরুত্তর থাকতে হয়। কী-ই বা বলবেন তিনি।
আর কটাক্ষেরও অন্ত নেই। স্বামী অষ্টম পালের আধার কার্ডে চোখ বুলিয়ে কেউ বলেন, 'স্বামীর বয়স ৪৫ বছর। আর স্ত্রীর ১০৬। তার মানে স্বামী আপনার চেয়ে ৬১ বছরের ছোট।' কারও খোঁচা, 'সেই হিসেবে তো লবণ সত্যাগ্রহ, ভারত ছাড়ো আন্দোলন, দেশভাগ, স্বাধীনতা, ভারত-চিন যুদ্ধ- সব কিছুরই সাক্ষী আপনি।' কৃষ্ণার দাবি, 'আধার কার্ডে ভুল বয়সের কারণে যাবতীয় সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। ভুল সংশোধনের জন্য প্রশাসনের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছি সেই কবে থেকে। কোনও সুরাহা হয়নি। শনিবার বিজেপি বিধায়কের দরবারেও গিয়েছিলাম। দেখি, তিনি কিছু করেন কি না।'
কৃষ্ণার স্বামী অষ্টমের একটি সাইকেল মেরামতির দোকান রয়েছে। সেটার উপরে ভরসা করেই কোনও রকমে চলে স্বামী-স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে অভাবের সংসার। ছেলেমেয়ে দু'জনেই স্কুল পড়ুয়া। তবে পাল দম্পতি নিরক্ষর। তাঁরা জানাচ্ছেন, ২০১২-য় গ্রামে আধার কার্ড তৈরির শিবির হয়েছিল। সেখানেই আধার কার্ডের জন্য আবেদন করেন কৃষ্ণা। নিজের ভোটার কার্ড আর বাবা ভগীরথ পণ্ডিতের নথিপত্র জমা দিয়েছিলেন। কৃষ্ণার নামে আধার কার্ডও আসে। সেই কার্ড নিয়েই গত ১৪ বছর প্রশাসনের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছেন পাল দম্পতি। কারণ, আধার কার্ডে কৃষ্ণার জন্মের তারিখ ভুল রয়েছে। আধার কার্ড অনুযায়ী, তাঁর জন্ম ১৯২০-তে।
কৃষ্ণা জানান, আসলে তাঁর জন্ম ১৯৯০-এ। ভোটার কার্ডেও তাই রয়েছে। এখন তাঁর আসল বয়স ৩৬ বছর। কিন্তু, আধার কার্ডে ১০৬ বছর। পাল দম্পতির অভিযোগ, ওই ত্রুটি সংশোধনের জন্য বছরের পর বছর প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে গিয়েছেন তাঁরা। আধার সেন্টারেও গিয়েছেন। কিন্তু, সমস্যার সমাধান হয়নি। 'অন্নপূর্ণা যোজনা'র জন্য আবেদন করেছিলেন। বয়সের ত্রুটির কারণে সে প্রকল্প থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন।
কৃষ্ণার স্বামী অষ্টমের কথায়, 'সকলেই বলছে, বয়সের প্রমাণপত্র ছাড়া ওই ভুল সংশোধন করা যাবে না। কিন্তু, ভুলটা তো করেছে যারা কার্ড তৈরি করেছে তারা। আমাদের দোষ কোথায়? তাছাড়া সরকারি বাবুরা চাইছে বার্থ সার্টিফিকেট, মাধ্যমিকের অ্যাডমিট। কিন্তু, সে সবও তো ওর নেই। এখন শুনছি, আধার কার্ড ছাড়া কোনও পারছি না।'
শনিবার মনোহরপুর গ্রামে 'জনতার দরবার' করেন চন্দ্রকোণার বিজেপি বিধায়ক সুকান্ত দোলই। সে খবর পেয়ে স্ত্রীকে নিয়ে সেখানে গিয়েছিলেন অষ্টম। নথিপত্র জমা করিয়ে বিধায়কের কাছে তাঁদের সমস্যার কথা জানিয়ে এসেছেন। সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন বিধায়ক। তিনি বলেন, 'ওই মহিলা আমার কাছে এসেছিলেন। এত দিন সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন। এটা খুবই দুঃখজনক ঘটনা। ওঁর জন্ম সার্টিফিকেট বা বয়সের অন্য কোনও নথি নেই। মহকুমাশাসকের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা করে দ্রুত ভুল সংশোধনের ব্যবস্থা করা হবে।'