• ধর্ষণ থেকে রক্ত পাচার, হাসপাতাল দুর্নীতির ডেরা! তিন কর্মী গ্রেপ্তার, মুখ খুলছেন বাসিন্দারা
    এই সময় | ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • দিগন্ত মান্না, পাঁশকুড়া

    হাসপাতালের মধ্যে একাধিক ওয়ার্ড গার্লকে লাগাতার ধর্ষণ, চিকিৎসককে মারধর, বিনা চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু, হাসপাতালের ব্লাড ব্যাঙ্ক থেকে রক্ত পাচার- তৃণমূল জমানায় এমন নানা ধরনের অভিযোগ ওঠে পাঁশকুড়া সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে। রাজ্যে পালা বদলের পরেই গ্রেপ্তার হয় ওই হাসপাতালের তিন ল্যাব টেকনিশিয়ান। এরপরেই এলাকার লোকজন মুখ খুলতে শুরু করেছেন। এলাকার মানুষের দাবি, হাসপাতালের দুর্নীতি চক্রের শেকড় আরও অনেক দূর পর্যন্ত রয়েছে। তৃণমূলের আমলে হাসপাতালে দুর্নীতি চলার অভিযোগ তুলেছে বিজেপিও।

    ২০১৫ সালে পাঁশকুড়া সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল তৈরি হওয়ার পরে স্থানীয় যুবক হিসেবে হাসপাতালে আসা যাওয়া শুরু হয় জাহির আব্বাস খান নামে এক যুবকের। হাসপাতালের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা একটি সংস্থার ফেসিলিটি ম্যানেজার হিসেবে কাজ শুরু করেছিল জাহির। এর পাশাপাশি জাহির অ্যাম্বুল্যান্স ব্যবসা শুরু করে। অভিযোগ, তৃণমূল ঘনিষ্ঠ জাহির সংস্থার নিরাপত্তা কর্মীদের উপরে প্রভাব খাটাত। হাসপাতালের মধ্যে কয়েক জন শাগরেদ নিয়ে ঘুরত জাহির।

    ২০২২ সালে গাড়ি পার্কিংকে কেন্দ্র করে বচসার জেরে হাসপাতালের এক চিকিৎসককে মারধরের অভিযোগ ওঠে এক অ্যাম্বুল্যান্স চালকের বিরুদ্ধে। সেই ঘটনায় জাহির বাহিনী ওই চিকিৎসককে কার্যত নাস্তানাবুদ করে ছাড়ে বলে অভিযোগ। জাহির বাহিনীর দাপটে ওই চিকিৎসক চাকরি ছাড়তে বাধ্য হন বলে দাবি এলাকার মানুষের।

    শুধু তাই নয়, হাসপাতালের একটি ঘরে জাহির 'সেক্স র‍্যাকেট' চালাত বলে অভিযোগ। হাসপাতালের একটি ঘরে ওয়ার্ড গার্লদের নিয়ে গিয়ে জাহির নিয়মিত ধর্ষণ করত বলে অভিযোগ। গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয় জাহির। সম্প্রতি পাঁশকুড়া সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে বিনা চিকিৎসায় এক প্রৌঢ়ের মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে। পাঁশকুড়া সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের ব্লাড ব্যাঙ্ক থেকে রক্ত পাচারের অভিযোগে গত মাসে হাসপাতালের তিন জন ল্যাব টেকনিশিয়ানকে গ্রেপ্তার করে রাজ্য পুলিশের দুর্নীতি দমন শাখা। সম্প্রতি পাঁশকুড়া সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের তিন মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট সুব্রত দাস, মান্তু দাস এবং নজরুল ইসলামকে বরখাস্ত করেছে রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তর। ওই তিন জন আপাতত জেলে রয়েছেন।

    কোলাঘাটের বাসিন্দা রক্তযোদ্ধা অসীম দাস বলেন, 'চল্লিশ বছর ধরে রক্তদান শিবিরের আয়োজন করছি। পাঁশকুড়া সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালেও বহুবার রক্ত দিয়েছি। কিন্তু যে ভাবে সরকারি হাসপাতাল থেকে রক্ত পাচার হচ্ছে তাতে আমি মর্মাহত। অবিলম্বে পদক্ষেপ করুক রাজ্য সরকার।' পাঁশকুড়া সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের সুপার কৌশিককুমার ঢল আগেই জানিয়েছিলেন এ ব্যাপারে তিনি আগে কিছু জানতেন না। পাঁশকুড়ার পারলঙ্কা গ্রামের বাসিন্দা সুপ্রকাশ বাসুলি বলেন, 'ধর্ষণ থেকে শুরু করে রক্ত পাচার পাঁশকুড়া সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে দুর্নীতির চক্র সক্রিয়। হাসপাতালের সুপার প্রতিবার কিছু জানেন না বলে দায় এড়াতে পারেন না। স্বাস্থ্য দপ্তর এই হাসপাতালের দিকে বিশেষ ভাবে নজর দিক।'

    এ ব্যাপারে তমলুকের মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক বিভাস রায় বলেন, 'আমাদের নজরদারির অভাব নেই। তা সত্ত্বেও এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। বুঝে নিতে হবে হাসপাতালের আশেপাশে কোনও চক্র সক্রিয় রয়েছে। প্রশাসন নজর রেখেছে।' পাঁশকুড়া পশ্চিমের বিজেপি বিধায়ক সিন্টু সেনাপতি বলেন, 'তৃণমূল রাজত্বে পাঁশকুড়া সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে দুর্নীতির আখড়া হয়ে উঠেছিল। আমাদের সরকার সেগুলি খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেছে।'

  • Link to this news (এই সময়)