গুজরাত থেকে টন টন ইলিশ যাচ্ছে ঢাকায়, পুজোয় বাঙালির পাতে পড়বে না পদ্মার রুপোলি শস্য
আজ তক | ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দুর্গাপুজোর আগে বাংলাদশের ইলিশের দিকে তাকিয়ে থাকে বাঙালি তথা দেশবাসী। কিন্তু এবার ছবিটা সম্পূর্ণ উল্টো। পদ্মার ইলিশ ভারতে আসার বদলে বাংলাদেশে যাচ্ছে গুজরাতের ইলিশ। বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকাশ, গত দু’মাসে গুজরাত ও হাওড়া হয়ে প্রায় ৫০০ মেট্রিক টন ইলিশ বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। পুজোর আগে আরও প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ টন ইলিশ পাঠানোর অর্ডার রয়েছে। প্রতি কেজি প্রায় ৬০০ টাকা দরে পাঠানো হচ্ছে সেই দেশে।
পদ্মার ইলিশ কম, তাই ভরসা গুজরাটে
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ইলিশের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। পদ্মা, মেঘনা-সহ দেশের বিভিন্ন নদী ও উপকূলীয় অঞ্চলে ইলিশ ধরা পড়ে। কিন্তু চলতি মরশুমে বাংলাদেশের বাজারে পর্যাপ্ত ইলিশের জোগান নেই। ফলে দেশীয় চাহিদা মেটাতে আমদানির প্রয়োজন তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতেই গুজরাত থেকে ইলিশ বাংলাদেশে পাঠাতে হচ্ছে। হাওড়ার পাইকারি মাছ বাজারের ব্যবসায়ীদের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ইলিশের ঘাটতির কারণে প্রথমবারের মতো এভাবে গুজরাত থেকে বড় পরিমাণে ইলিশ পাঠানো হয়েছে। অর্থাৎ এতদিন যেখানে বাংলাদেশ ছিল ইলিশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস, এবার সেই বাংলাদেশই বাজারের চাহিদা মেটাতে ভারতের কাছ থেকে ইলিশ কিনছে।
কেন গুজরাতের ইলিশ?
প্রশ্ন উঠছে, ভারতের অন্য রাজ্য থাকতে গুজরাতের ইলিশকে কেন গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশের মানুষ? ব্যবসায়ীদের দাবি, এর অন্যতম কারণ ইলিশের ডিম। গুজরাত থেকে আসা ইলিশের মধ্যে ডিমওয়ালা মাছের পরিমাণ বেশি থাকে। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও সিলেটের বাজারে ডিমওয়ালা ইলিশের চাহিদা বিশেষভাবে বেশি। ফলে গুজরাতের মাছ দ্রুত ক্রেতা পেয়েছে।
তবে শুধু মাছ হিসেবেই নয়, ইলিশের ডিমও আলাদা করে বিক্রি হচ্ছে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। চট্টগ্রামসহ কিছু এলাকায় নোনা মাছ খাওয়ার চল থাকায় গুজরাত থেকে যাওয়া ইলিশ শুকিয়েও বাজারজাত করা হচ্ছে।
তাহলে কি বাংলাদেশ থেকে এবার ভারতে ইলিশ আসবে না?
প্রতিবার দুর্গাপুজোর আগে বাংলাদেশ থেকে ভারতে ইলিশ আসে। পুজোর বাকি আর মাত্র এক মাস। এবার ভারত ইলিশ আমদানি করবে কি না, সেটাই এখন লাখ টাকার প্রশ্ন। এখন জানা যাচ্ছে, দুর্গাপুজোর আগে বাংলাদেশি ইলিশ পাওয়ার জন্য ভারতের মাছ আমদানিকারকরা সক্রিয়ভাবে বাংলাদেশের সরকারের কাছে আবেদন করেছেন।
সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, কলকাতার মাছ আমদানিকারকদের একটি সংগঠন বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রীর কাছে চিঠি দিয়ে দুর্গাপুজোর আগে ভারতে ইলিশ রফতানির অনুমতি দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশের ১৮টি সংস্থা ভারতে ইলিশ রফতানির অনুমতির জন্য আবেদন করেছে। অর্থাৎ ব্যবসায়ীদের তরফে চাহিদা এবং রফতানির আগ্রহ- দুই-ই রয়েছে। এখন প্রয়োজন বাংলাদেশের সরকারের অনুমোদন।
বাংলাদেশে ইলিশ রফতানির ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই কড়া নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। তবে দুর্গাপুজোর সময় ভারতের বাজারের চাহিদার কথা মাথায় রেখে অতীতেও সীমিত পরিমাণে ইলিশ রফতানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালেও বাংলাদেশ সরকার দুর্গাপুজোর আগে ভারতে ১,২০০ টন ইলিশ রফতানির অনুমতি দিয়েছিল এবং ন্যূনতম রফতানি মূল্য নির্ধারণ করেছিল কেজিপ্রতি ১২.৫০ মার্কিন ডলার।
ফলে ২০২৬ সালে বাংলাদেশ থেকে ইলিশ ভারতে আসবে না- এমন সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি। বর্তমান পরিস্থিতি বরং এমন যে, ভারত ইলিশ চাইছে, বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা রফতানির অনুমতি চাইছেন, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষা রয়েছে। বাংলাদেশের সরকার অনুমতি দিলে সীমিত পরিমাণে পদ্মার ইলিশ আবারও পশ্চিমবঙ্গের বাজারে আসতে পারে।
একই সময়ে দু’দিকে চলছে ইলিশের বাণিজ্য
এই জায়গাতেই এবারের ইলিশ-বাণিজ্যের ছবিটা সবচেয়ে অদ্ভুত। একদিকে বাংলাদেশের বাজারে ভারতের গুজরাটের ইলিশ ঢুকছে, অন্যদিকে ভারতের ব্যবসায়ীরা আবার বাংলাদেশের পদ্মার ইলিশ চাইছেন দুর্গাপুজোর জন্য।
অর্থাৎ বাজারের চাহিদা দুই দিকেই রয়েছে। বাংলাদেশের ঘাটতি পূরণে ভারতের ইলিশ যাচ্ছে বাংলাদেশে। আবার পশ্চিমবঙ্গের ক্রেতাদের কাছে পদ্মা-মেঘনার ইলিশের আলাদা চাহিদা থাকায় ভারতীয় ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশের ইলিশ আমদানির অনুমতি চাইছেন।
কলকাতার বাজারের সঙ্গে বদলে গেল সমীকরণ
সাধারণত দুর্গাপুজোর আগে বাংলাদেশ থেকে ইলিশ ভারতে এলে পশ্চিমবঙ্গের বাজারে তার আলাদা চাহিদা তৈরি হয়। পদ্মার ইলিশকে ঘিরে তৈরি হয় উৎসবের আবহ। বহু বছর ধরে পুজোর আগে বাংলাদেশ থেকে ইলিশ আসা দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সম্পর্কের সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে।
২০২৬ সালে সেই পরিচিত ছবির বদলে শুরুতেই দেখা গেল উল্টো স্রোত। গুজরাত থেকে বাংলাদেশে যাচ্ছে ইলিশ। তবে বাংলাদেশের পদ্মার ইলিশ পশ্চিমবঙ্গে একেবারেই আসবে না- এ কথা বলার সময় এখনও আসেনি। কারণ ভারতীয় আমদানিকারকরা অনুমতির জন্য আবেদন করেছেন এবং বাংলাদেশের ১৮টি সংস্থাও রফতানির অনুমতি চেয়েছে।
শুধু স্বাদের প্রশ্ন নয়, বদলেছে সরবরাহের অঙ্কও
ইলিশের ক্ষেত্রে স্বাদ, আকার, তেল ও ডিম- সবকিছুরই বাজারমূল্য রয়েছে। কিন্তু এবারের পরিস্থিতিতে সরবরাহই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। গুজরাতের নর্মদা নদীর মোহনা ও আরব সাগর সংলগ্ন এলাকায় ইলিশের জোগান সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ব্যবসায়ীদের নজর কেড়েছে। পশ্চিমবঙ্গের বাজারেও গুজরাটের ইলিশের সরবরাহ বেড়েছে। এবার সেই সরবরাহ ব্যবস্থার পরিধি আরও বড় হয়েছে- ভারতীয় ইলিশ পৌঁছে যাচ্ছে বাংলাদেশের বাজারেও।
পুজোর বাজারে শেষ পর্যন্ত কী হবে?
পশ্চিমবঙ্গের বাজারে পদ্মার ইলিশ ঢুকবে কি না, তার সিদ্ধান্ত এখনও বাংলাদেশের হাতে। ভারতীয় আমদানিকারকরা অনুমতি চেয়েছেন, বাংলাদেশের সংস্থাগুলিও রফতানির আবেদন করেছে। ফলে শেষ মুহূর্তে সীমিত পরিমাণে বাংলাদেশের ইলিশ ভারতে আসার সম্ভাবনা খোলা রয়েছে।
তাই এবারের ছবিটা বাংলাদেশের ইলিশ নেই, গুজরাতের ইলিশই সব —এত সরল নয়। বরং একই সময়ে দুই দেশের বাজারে দেখা যাচ্ছে ইলিশের দুই বিপরীত স্রোত। বাংলাদেশের বাজারে চাহিদা মেটাতে যাচ্ছে ভারতের গুজরাতের ইলিশ। আর দুর্গাপুজোর পাতে পদ্মার ইলিশ ফেরাতে বাংলাদেশের সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় পশ্চিমবঙ্গের মাছ ব্যবসায়ীরা।