• কে কোন দলে? জল্পনা জগদীশে, কটাক্ষ শমীকের, নানা মত কাকলি, তাহেরদের
    এই সময় | ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • এই সময়, কলকাতা ও কোচবিহার: তৃণমূলের বিদ্রোহী ২০ সাংসদ এনসিপিআইয়ে যোগ দিলেও তাঁদের ভবিষ্যৎ কী, তা নিয়ে জল্পনা চলছিলই। এর মধ্যে সোমবার এই ২০ জন সাংসদের অন্যতম, কোচবিহারের এমপি জগদীশ বর্মা বসুনিয়ার দাবি ঘিরে নতুন করে জলঘোলা শুরু হলো। এ দিন তাঁর দাবি, এনসিপিআই সাংসদদের মধ্যে মুর্শিদাবাদের তিন সংখ্যা‍লঘু এমপি–কে বাদ দিয়ে বাকি ১৭ জন বিজেপিতে যাবেন। যদিও বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য এই সম্ভাবনা সটান খারিজ করে দিয়েছেন। জগদীশের বক্তব্য সমর্থন করেননি এনসিপিআইয়ের বর্ষীয়ান সাংসদ কাকলি ঘোষদস্তিদার বা শতাব্দী রায়ও। মুর্শিদাবাদ লোকসভা কেন্দ্রের সাংসদ আবু তাহের খান আবার সরাসরি বসুনিয়ার বক্তব্যের বিরোধিতা করেছেন।

    হঠাৎ জগদীশ কেন এই মন্তব্য করলেন— এ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিতর্কের মুখে বসুনিয়া তাঁর বয়ান সামান্য বদলও করেছেন। এই টানাপড়েনের মধ্যে তৃণমূলের কালীঘাট শিবির মনে করছে, কিছুদিন পরেই সুপ্রিম কোর্টে এই এনসিপিআই সাংসদদের নিয়ে মামলার শুনানি রয়েছে। আবার ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ (এআইটিসি) নাম এবং জোড়াফুল প্রতীক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে থাকবে, নাকি বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী শিবিরের কাছে যাবে, তাও স্পষ্ট নয়। এই অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে জগদীশ নিজে আগ বাড়িয়ে বিজেপিতে যাওয়ার কথা বলেছেন কি না— এই প্রশ্নও উঠেছে।

    তৃণমূল ছেড়ে কাকলি, শতাব্দী, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়দের সঙ্গে জগদীশ বসুনিয়া এনসিপিআইয়ে যাওয়ার পরে দীর্ঘদিন কোচবিহারে নিজের বাড়িতে ফিরতে পারছিলেন না। অবশেষে গত সপ্তাহে তিন‍ি জেলায় ফিরলেও রবিবার তাঁর বাড়ির সামনে প্রবল বিক্ষোভ হয়। কাছেই তৃণমূলের একটি অফিসে অগ্নিসংযোগও হয়। এই পরিস্থিতিতে সোমবার সকালে সাংবাদিকদের ডেকে বসুনিয়া বলেন, ‘বিজেপির নেতা ভূপেন্দ্র যাদব এবং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে বৈঠক হয়েছিল। আমাদের সঙ্গে দুই তৃতীয়াংশ সাংসদ, অর্থাৎ ২০ জন থাকায় দলত্যাগ বিরোধী আইন কার্যকর হতো না। কিন্তু তিন জন সংখ্যালঘু সাংসদ আপত্তি করেছিলেন বলে বিজেপিতে যাওয়া হয়নি। সেই কারণে আপাতত আমরা একটি নথিভুক্ত, কিন্তু স্বীকৃতি না থাকা দলে মার্জ করব বলে ঠিক হয়। সেখান থেকে আমরা বিজেপিতে যাব। তার আগে এনসিপিআইয়ের নাম শুনিনি।’

    কালীঘাটের হাত ছেড়ে তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায়, প্রকাশ চিক বরাইক, সুস্মিতা দেব বিজেপিতে যোগদান করেই ফের রাজ্যসভার টিকিট পেয়েছেন। কিন্তু সুদীপ–কাকলিদের ভবিষ্যৎ এখনও স্পষ্ট নয়। জগদীশ সেই রোডম্যাপ নিয়ে পরে বলেন, ‘এখন আমাদের বিজেপিতে যেতে কোনও বাধা নেই। এনসিপিআইয়ে অ্যাপ্রুভাল হলে তিন জন সংখ্যালঘু সাংসদ এনসিপিতে থেকে যেতে পারেন, বাকি ১৭ জন বিজেপিতে চলে যাব।’ এনসিপিআই সাংসদ হিসেবে আবু তাহের, খলিলুর রহমান, ইউসুফ পাঠানকে কেন্দ্রীয় সরকারের কোনও মন্ত্রকের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে বলেও জানান বসুনিয়া।

    যদিও তাঁর এই বক্তব্য কার্যত উড়িয়ে দিয়ে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেন, ‘যে বিজেপিতে ওঁরা যোগদান করতে চাইছেন, সেটা হয়তো মঙ্গল গ্রহের বিজেপি ইউনিট। ২০২১–এর ভোটের পরে বিজেপি কর্মীদের উপরে কী অত্যাচার হয়েছিল, এটা ভুললে চলবে না। বিজেপিতে আজ যোগদান করতে চাইবেন, বিজেপি নিয়ে নেবে এটা হবে না। তিন জনকে নেওয়া হয়েছে মানে ২৩ জনকে নেওয়া হবে, এটা ভাবার কোনও কারণ নেই।’

    সূত্রের দাবি, বসুনিয়ার মন্তব্য নিয়ে এনসিপিআইয়ের একদল সাংসদ ঘরোয়া স্তরে এ দিন একপ্রস্ত আলোচনাও করেছেন। কেন তিনি এমন মন্তব্য করলেন— এসসিপিআইয়ের এক সাংসদ ফোন করে তা জগদীশের কাছ থেকে জানতে চেয়েছেন বলেও একটি সূত্রের খবর। প্রকাশ্যে কাকলি বলেছেন, ‘কেউ যদি কারও সঙ্গে কোনও আলোচনা না–করে নিজের দায়িত্বে কোনও মন্তব্য করেন, তা হলে সেই বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেওয়ার দায়িত্ব তাঁর।’ একই সুরে শতাব্দীর বক্তব্য, ‘আমি কিছু বলতে চাই না। যিনি বলছেন, তাঁকে ব্যাখ্যা দিতে হবে। এই বিষয়ে কথা বলার সময় এটা নয়। সময় বলবে কী হবে, না–হবে।’ কোচবিহারের সাংসদকে কার্যত আক্রমণ করেছেন আবু তাহের। মুর্শিদাবাদের সাংসদের সাফ কথা, ‘উনি আমাদের মুখপাত্র নন। জগদীশ বসুনিয়াকে আমি দায়িত্ব দিইনি, আগামী দিনে কী করব তা বলার। আমরা বিজেপিতে যাব না। এনডিএ–তেও যাব না। উন্নয়নের স্বার্থে প্রধানমন্ত্রী অথবা মুখ্যমন্ত্রী যদি কোনও বৈঠক ডাকেন, সেখানে যাব।’

    জগদীশ নিজে এনসিপিআইয়ে আছেন, আবার তাঁর স্ত্রী সঙ্গীতা ঋতব্রতর নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী তৃণমূলে রয়েছেন। এই সমীকরণের মধ্যে জগদীশ বিজেপিতে যাওয়ার রোডম্যাপ ঘোষণা করায় কালীঘাট–তৃণমূলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ বলেন, ‘এই ২০ জন বিজেপি বিরোধী ভোটে জয়ী হয়ে এখন মানুষের সঙ্গে বেইমানি করছেন। বিজেপি নেতাদের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ওঁরা যত কথা বলছেন, দুর্গন্ধ বেরোচ্ছে। ওঁর বিধায়ক স্ত্রী আবার অন্যদিকে গিয়েছেন। চূড়ান্ত সুবিধাবাদী।’ কুণালকে পাল্টা জবাব দিয়েছেন ঋতব্রত। বিরোধী দলনেতা বলেন, ‘সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় এনসিপিআইয়ে রয়েছেন, কিন্তু নয়না বন্দ্যোপাধ্যায় তো কালীঘাটের সঙ্গে আছেন। সেটা কী?’

  • Link to this news (এই সময়)