আধার কার্ড না থাকায় বন্ধ রেশন, অসুস্থ ছেলের চিন্তায় দিশাহার দিনমজুর বাবা
বর্তমান | ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সংবাদদাতা, ডোমকল: প্রকাণ্ড শরীরটাই এখন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় বোঝা। ওজন দেড় কুইন্টাল ছুঁইছুঁই। সেই শরীরটুকু বাঁচিয়ে রাখতে প্রতিদিন প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ খাবার। প্রয়োজন চিকিৎসারও। অথচ অভিযোগ, আধার কার্ড না থাকায় বছর দেড়েকেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ রেশন। টাকার অভাবে বন্ধ চিকিৎসাও। এবার আধার না থাকায় বন্ধ হওয়ার মুখে অন্যান্য পরিষেবাও। বছর আঠাশের সেই ছেলের ছেলের খাবারের বিপুল খরচ, অন্যদিকে সংসার ও চিকিৎসার ব্যয়, সব মিলিয়ে কার্যত দিশেহারা দিনমজুর বাবা। এই ছবি ইসলামপুরের পমাইপুরের মোস্তফাপাড়ার।
স্থানীয় ও প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, পমাইপুর মোস্তফাপাড়ার বাসিন্দা মোস্তাফিজুর রহমানের বয়স ২৮ বছর। বাবা আবুল হাসান দিনমজুর। একসময় আর পাঁচটা শিশুর মতোই স্বাভাবিক ছিলেন মোস্তাফিজুর। খেলাধুলা করতেন, হাঁটতেন, কথাবার্তাও বলতেন। বছর সাতেক বয়সে মাকে হারানোর পর থেকেই ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে তাঁর জীবন। সময়ের সঙ্গে অস্বাভাবিক হারে বাড়তে থাকে শরীরের ওজন। কমতে থাকে হাঁটাচলার ক্ষমতা। একসময় কথাবার্তাও বন্ধ হয়ে যায়। এখন নিজের পায়ে দাঁড়ানো তো দূরের কথা, বাড়ির বাইরে বেরনোই কার্যত অসম্ভব।
ছেলেকে সুস্থ করে তুলতে প্রথম দিকে বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসার জন্য ছুটেছিলেন আবুল। কিন্তু চিকিৎসার খরচ, যাতায়াত এবং ছেলের ক্রমশ বেড়ে চলা শারীরিক সমস্যার সঙ্গে আর পাল্লা দিতে পারেনি অভাবের সংসার। একসময় থেমে যায় চিকিৎসাও। বর্তমানে স্যাঁতসেঁতে বাড়ির বারান্দাই মোস্তাফিজুরের পৃথিবী। খাওয়া থেকে শৌচকর্ম, দৈনন্দিন প্রায় প্রতিটি কাজেই বাবার সাহায্য প্রয়োজন তাঁর।
এরই মধ্যে পরিবারের সমস্যায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে আধার কার্ড। পরিবারের অভিযোগ, আধার তৈরির জন্য একাধিকবার যোগাযোগ করেও এখনও তা হয়নি। আর আধার না থাকায় প্রায় দু’বছর ধরে বন্ধ রেশনের চাল। অথচ মোস্তাফিজুরের খাবারের প্রয়োজন সাধারণ মানুষের তুলনায় অনেকটাই বেশি। পরিবারের দাবি, প্রতিদিন প্রায় দেড় কেজি চালের ভাত এবং পাঁচশো গ্রামেরও বেশি ময়দার রুটি খেতে হয় তাঁকে। রেশন বন্ধ হওয়ার পর সেই বিপুল পরিমাণ খাবারের জোগান দিতে গিয়ে আরও চাপে পড়েছে পরিবার।
এদিকে ছেলেকে একা রেখে নিয়মিত কাজে যেতেও পারেন না দিনমজুর বাবা। ফলে কাজের দিন কমে, কমে আয়ও। আর আয় কমলেই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে মোস্তাফিজুরের খাবারের জোগান। এভাবেই অসুস্থতা, অভাব আর পরিষেবা বঞ্চনার এক চক্রে আটকে পড়েছে পরিবারটি।
মোস্তাফিজুরের বাবা আবুল হাসান বলেন, ছেলেটাকে এই অবস্থায় দেখে ভীষণ কষ্ট হয়। সরকারি সাহায্য তো দূরের কথা, যে কয়েকটা পরিষেবা পেত, আধার কার্ড না থাকায় সেগুলিও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এখনও ছেলের আধার কার্ড হয়নি। দু’বছর ধরে রেশন বন্ধ। এখন শুনছি প্রতিবন্ধী ভাতাটাও বন্ধ হয়ে যাবে। টাকার অভাবে ছেলের ঠিকমতো চিকিৎসাও করাতে পারিনি। আমারও বয়স হয়েছে। ছেলে একা কিছুই করতে পারে না। খুব দুশ্চিন্তা হয়, অসহায় লাগে।
স্থানীয় বাসিন্দা মহম্মদ নাসিম খান বলেন, মানবিক দিক থেকে হলেও দ্রুত মোস্তাফিজুরের আধার কার্ড তৈরির ব্যবস্থা করা দরকার। রেশন পরিষেবা চালু করার পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগে তাঁর চিকিৎসারও ব্যবস্থা করা উচিত।
প্রশাসন সূত্রের দাবি, বিষয়টি তাঁদের এখনও জানা নেই। পরিবারের তরফেও কোনও অভিযোগ জানানো হয়নি। পরিবারটি সমস্যার কথা জানালে বিষয়টি খতিয়ে দেখে যতটা সম্ভব সাহায্যের চেষ্টা করা হবে।
রানিনগরের বিধায়ক জুলফিকার আলি বলেন, ওই ছেলেটির বিষয়ে এখনও কিছু জানি না। খোঁজ নিয়ে দেখছি। স্থানীয় নেতৃত্বের সঙ্গে কথা বলে কী করা যায়, তা দেখব। চেষ্টা করছি।