আজকাল ওয়েবডেস্ক: ত্বকে চুলকানি, লালচে ব়্যাশ, ক্ষত কিংবা বারবার ত্বক থেকে তরল নিঃসরণ, একজিমাকে অনেকেই নিছক ত্বকের সমস্যা বলে মনে করেন। কিন্তু বাস্তবে এর প্রভাব শুধু ত্বকেই সীমাবদ্ধ নয়।
দিনের পর দিন চুলকানি, ঘুমের ব্যাঘাত, বারবার রোগের প্রকোপ এবং ত্বকের দৃশ্যমান ক্ষত রোগীর দৈনন্দিন জীবনযাত্রার উপরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে একজিমা তৈরি করতে পারে সামাজিক সংকোচ ও হীনমন্যতা।
এই বিষয়েই সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে উদ্যোগী হয়েছে Society of Eczema Studies। একজিমা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, সামাজিক কুসংস্কার বা ‘স্টিগমা’ দূর করা এবং রোগীদের সঠিক চিকিৎসার আওতায় আনার উপর বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে এই সংগঠন।
চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতে অ্যাটোপিক ডার্মাটাইটিসের প্রাদুর্ভাব আনুমানিক ১১ শতাংশ। অ্যাটোপিক ডার্মাটাইটিস মূলত শিশুদের মধ্যেই বেশি দেখা যায়। বহু ক্ষেত্রে শৈশবেই এর উপসর্গ শুরু হয়।
ফলে শিশুদের দীর্ঘস্থায়ী ত্বকের সমস্যাগুলির মধ্যে এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। একজিমার মানসিক প্রভাব কতটা গভীর হতে পারে, তারই একটি উদাহরণ পাঁচ বছরের এক শিশু।
পোকামাকড়ের কামড় কিংবা কিছুর সংস্পর্শে তার ত্বকে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিত। শরীরে তৈরি হতো চুলকানিযুক্ত ব়্যাশ ও একজিমার ক্ষত। অনেক সময় সেই ক্ষত থেকে তরলও বের হত।
ফলে শারীরিক কষ্ট তো বটেই, শিশুটির মধ্যে দেখা দিয়েছিল ভয়। বারবার চিকিৎসকের কাছে যেতে যেতে তার মনে ধারণা তৈরি হয়েছিল, সে বুঝি দীর্ঘস্থায়ী কোনও গুরুতর রোগে আক্রান্ত এবং অন্যদের থেকে সে আলাদা।
এর প্রভাব পড়েছিল তার বাবা-মায়ের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরেও। তবে সঠিক কাউন্সেলিং, রোগ সম্পর্কে শিশুকে সহজভাবে বোঝানো এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে অভিভাবকদের সচেতন করার পর পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে।
বোঝানো হয়, অ্যাটোপিক ডার্মাটাইটিস কোনও অভিশাপ বা ভয়াবহ সংক্রামক রোগ নয়। শুধু শিশুদের ক্ষেত্রে নয়, প্রবীণদের ক্ষেত্রেও একজিমা তৈরি করতে পারে নানা ধরনের শারীরিক ও মানসিক সমস্যা।
টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও হাঁপানিতে আক্রান্ত হওয়া ৬৫ বছরের এক ব্যক্তির শরীরের ভাঁজযুক্ত অংশে দেখা দেয় ‘ফ্লেক্সুরাল একজিমা’। স্ত্রী-বিয়োগের পর একাই থাকেন তিনি।
সন্তানরা কর্মসূত্রে দূরে থাকায় একাকীত্ব এই সমস্যা বাড়িয়ে দিয়েছিল। নিয়মিত কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে ধীরে ধীরে তাঁর শারীরিক দুর্বলতা কমে এবং মানসিক স্থিতিশীলতাও ফিরে আসে।
একজিমা সম্পর্কে সচেতন করতে দেশজুড়ে কাজ করছে SES। ভারতে একজিমার প্রাদুর্ভাব, চিকিৎসার ধরন এবং চিকিৎসার ফলাফল সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি ক্লিনিক্যাল, জেনেটিক ও মলিকিউলার গবেষণাকেও উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।
SES-এর সভাপতি চিকিৎসক সন্দীপন ধর বলেন, ‘একজিমা শুধু ত্বকে দেখা উপসর্গের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘস্থায়ী চুলকানি, ঘুমের সমস্যা এবং বারবার রোগের প্রকোপ একজন মানুষের আত্মবিশ্বাস ও স্বাভাবিক জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে। সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।’
তিনি আরও বলেন, ‘সচেতনতা বাড়লে একজিমা নিয়ে ভুল ধারণা ও সামাজিক সংকোচ অনেকটাই কমানো সম্ভব।’
শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অভিজিৎ সাহা বলেন, ‘আমাদের এই উদ্যোগ নতুন নয়, চলছে বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে। একজিমার ক্ষেত্রে সবথেকে জরুরি সচেতন থাকা। আমাদের চেষ্টা রয়েছে গ্রামের দিকে এই সচেতনতা ও চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়ার।’
সংগঠনের এই উদ্যোগে ড. সন্দীপন ধরের নেতৃত্বে ড. রঘুবীর ব্যানার্জি, ড. রাজীব মালাকার, ড. অভিজিৎ সাহা এবং ড. সাফিয়া বশীর-সহ চিকিৎসকদের একটি দল কাজ করছে। একজিমা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিই তাঁদের মূল লক্ষ্য।