রিয়া পাত্র: তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই ফের সরাসরি দেশের সর্বোচ্চ আদালতের দরবারে পৌঁছাল। দলের প্রতীক ও কর্তৃত্ব নিয়ে টানাপোড়েনের মাঝেই ঋতব্রত ব্যানার্জি শিবিরের ন্যাশনাল ওয়ার্কিং কমিটির ১০ শীর্ষ বিধায়কের পদ খারিজের দাবি তুলে সুপ্রিম কোর্টে স্পেশাল লিভ পিটিশন (SLP) দাখিল করল মমতা ব্যানার্জির কালীঘাট তৃণমূল। কালীঘাটের তরফে প্রবীণ নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নামেই এই গুরুত্বপূর্ণ মামলা দায়ের করা হয়েছে।
যে ১০ জন বিধায়কের সদস্যপদ খারিজের আবেদন জানানো হয়েছে, তাঁরা প্রত্যেকেই ঋতব্রত গোষ্ঠীর গঠিত নতুন জাতীয় কর্মসমিতির শীর্ষ স্তরে রয়েছেন। তালিকায় রয়েছেন রাজ্যের একাধিক হেভিওয়েট নেতা ও মন্ত্রী—অরূপ রায়, ফিরহাদ হাকিম, সন্দীপন সাহা, আখরুজ্জামান, শিউলি সাহা, সাবিনা ইয়াসমিন, বিপ্লব মিত্র, জাভেদ খান এবং রথীন ঘোষ। এর আগে যেভাবে সাংসদ পদ খারিজের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, ঠিক একই পথ অনুসরণ করে এবার দলবিরোধী কাজের অভিযোগে এই বিধায়কদের বিধানসভা থেকে সরানোর আর্জি জানানো হয়েছে।
এই মামলার আবেদনকারী হিসেবে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তৃণমূলের ভাঙনের মূলে শোভনদেবকে বিরোধী দলনেতা হিসেবে তুলে ধরার জন্য বিধায়কদের সই সংগ্রহ এবং সেই সই জালিয়াতির বিতর্কই অন্যতম অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল। সেই শোভনদেবই এবার সুপ্রিম কোর্টে আইনি লড়াইয়ের মুখ। শুধুমাত্র এই ১০ জনের বিরুদ্ধেই কেন মামলা—তার জবাবে শোভনদেব জানান, যেহেতু এঁরা প্রত্যেকেই ঋতব্রত শিবিরের নবগঠিত ন্যাশনাল ওয়ার্কিং কমিটিতে নীতি-নির্ধারক বা ‘মাথা’ হিসেবে রয়েছেন, তাই সবার আগে শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধেই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এই বিধায়কেরা দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূলের সমস্ত সুযোগ-সুবিধা ও নির্বাচনী তহবিল ব্যবহার করে জয়ী হয়েছেন। কিন্তু এখন দলের প্রতিষ্ঠাতা মমতা ব্যানার্জির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে লড়াইয়ে নেমে সমান্তরাল সংগঠন তৈরি করা চরম রাজনৈতিক নীতিহীনতা।
কালীঘাট শিবিরের এই আইনি পদক্ষেপের খবর প্রকাশ্যে আসতেই তীব্র ব্যঙ্গ ও হুঁশিয়ারির সুরে পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ঋতব্রত ব্যানার্জি। সোশ্যাল মিডিয়ায় এক ভিডিও বার্তায় তিনি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের সুর ধার করে কটাক্ষের সুরে বলেন, “কী বলি বলুন তো? বহিষ্কারের ফাঁদ পাতা ভুবনে, কোথায় কে ধরা পড়ে কে জানে!”
কালীঘাট শিবিরের নেতা ও আইনজীবীদের নিশানা করে ঋতব্রত বলেন, “কে কাকে বহিষ্কার করবে? কটা দিন অপেক্ষা করুন না আইনজীবী বন্দ্যোপাধ্যায়, কটা দিন ওয়েট করে যান।” বিধায়ক ও সাংসদদের পদ খারিজ নিয়ে কালীঘাট শিবিরের তৎপরতাকে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, “বিধায়কদের সাংসদদের পদ খেয়ে নেবেন? বড় বড় ডায়লগ দিচ্ছেন, বুকনি মারছেন! আমি বলছি কটা দিন ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করুন। ওখানে সাংসদদের পদ খাবেন, এখানে বিধায়কদের পদ খাবেন? ১০ জনের পদ খাবেন আর বাকিদের অক্সিজেন দেবেন যে, ফিরে গেলে টাইম দেবেন? এসব করার আগে দু’বার ভাববেন। আমার তো উল্টে সন্দেহ হয়, আপনি সহ আপনার সঙ্গে থাকা বিধায়কদের পদ আদৌ থাকবে তো?”
একই সঙ্গে হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, “এত সহজে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছাবেন না। বড্ড তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত হয়ে যাচ্ছে। সবাই একটু সময় নিন, ধৈর্য ধরুন। কটা দিন গেলেই টের পাবেন কে কার সাংসদ পদ আর বিধায়ক পদ খারিজ করে! সব একদম জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে।” ফলে শীর্ষ আদালত ও রাজনৈতিক ময়দান—উভয় ক্ষেত্রেই যে তৃণমূলের দুই শিবিরের লড়াই চূড়ান্ত রূপ নিতে চলেছে, তা স্পষ্ট।