জয় সাহাদমদমের ঘিঞ্জি এলাকায় প্রচার করছেন বাম প্রার্থী সুজন চক্রবর্তী। বামেদের প্রচারে স্লোগান উঠছে, ‘হাতে হাতে কমরেড...!’ স্লোগানের সঙ্গে তাল রেখেই সুজন এক কমরেডের হাতে হাত রেখে হাঁটছেন। ভোটাররা কেউ ফ্ল্যাটের টপ ফ্লোর থেকে হাত নাড়ছেন, কেউ বেরিয়ে আসছেন ঝুপড়ি থেকে। ফ্ল্যাটের টপ ফ্লোর হোক অথবা ঝুপড়ি, ভোটার তো ভোটার, সবাইকে অ্যাড্রেস করতে গিয়ে হাঁটার সময়ে সুজনের মাথা অনবরত ঘুরপাক খাচ্ছে।
দৃষ্টি কখনও উপরে, কখনও ডানে, কখনও বাঁয়ে। অনবরত উপর-নীচ হতে হতে মাথা ঘুরে যেতে পারে। হারিয়ে যেতে পারে দেহের ব্যালান্স। তাই চিকিৎসকের পরামর্শেই সুজন ওই কমরেডকে পারতপক্ষে হাতছাড়া করছেন না। হাত-হাতুড়ির জোটের প্রার্থী সুজনের বড় ভরসা ওই কমরেডের হাত। মাথা ঘুরে গেলে তিনি যেন অন্তত হাত ধরে রক্ষা করতে পারে সুজনকে।
ভোট নিয়ে নচিকেতার গানে আছে, ‘ডাইনে বাঁয়ে, গঞ্জে গাঁয়ে...পুরোনো অথবা নতুন অধ্যায়।’ ভোটের অধ্যায় শুরু হয়ে গিয়েছে। ডান, বাম সব পক্ষই রাজপথে। গঞ্জে, গাঁয়ে, শহরে ভোট চাইতে ভোটারের দুয়ারে প্রার্থী। ভোট চাইতে গিয়েই শরীর, স্বাস্থ্য, রোদ, জল উপেক্ষা করে প্রার্থীরা হাঁটছেন, ছুটছেন, গাড়িতে উঠছেন, মাঠে খেলছেন এমনকী জলেও নামছেন। এতে প্রার্থীদের মাথাও ক্রমাগত ঘুরছে।
একদিকে হাঁটা আর অন্য দিকে গরম, তার উপর মাথা-ঘাড়ের এই অনবরত ‘মুভমেন্টে’—একা সুজনের নয়, অনেক প্রার্থীরই মাথা ঘুরে যাচ্ছে, ঘাড়ে ব্যথা হচ্ছে। মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার ভয়ও থাকছে। রোদে চোখেও ধাঁধাও লাগছে। সুজনই যেমন বলছিলেন, ‘এই আনইভেন নেক মুভমেন্টে ভয় থাকে ব্যালান্স হারিয়ে পড়ে যাওয়ার, অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার। সেই কারণে ডাক্তারের পরামর্শেই এক কমরেডকে সর্বক্ষণ সঙ্গে রাখছি। শুধু গাড়িতে প্রচার করছি না। অনেক পথ হাঁটতেও হচ্ছে। তাই সাবধান থাকতে হচ্ছে।’
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, প্রখর রোদে মাথা, ঘাড়ের অনবরত উপর, নীচ, ডাইনে-বাঁয়ে হওয়া নিয়ে সাবধান থাকতে হবে প্রার্থীদের। নইলে যে কোনও সময়ে কোলাপস করে যাওয়াও অসম্ভব নয়। সতর্ক থাকতে হবে গরম নিয়েও। বিশেষ করে প্রৌঢ়, প্রবীণ ও ক্রনিক রোগ আছে এমন প্রার্থীদের। সুজনের প্রতিদ্বন্দ্বী দমদমের বিদায়ী সাংসদ, তৃণমূল প্রার্থী সৌগত রায় বর্ষীয়ান রাজনীতিক।
তাঁর বক্তব্য, ‘এখনও অনেক দিন টানতে হবে। গরম থেকে সুস্থ থাকাটাই আসল কথা। এই কারণে বার বার জল খাচ্ছি। নিয়মিত ওষুধগুলো খেতে হচ্ছে। আর আমি দেখেছি ঘুমটা পর্যাপ্ত হলে অনেক শারীরিক সমস্যাই মেটে। তাই চেষ্টা করছি ঘুমের যাতে ঘাটতি না হয়।’ মুর্শিদাবাদের বাম প্রার্থী মহম্মদ সেলিম অবশ্য এই মাথা ঘুরে যাওয়া, নেক মুভমেন্টের জন্য আগাম ব্যবস্থা নেন। সেলিমের কথায়, ‘দূর থেকে চোখে একটা আগাম ম্যাপিং করে রাখলে সমস্যা কম হয়। তবে আমি যে এলাকায় দাঁড়িয়েছি, সেখানে বহুতল নেই বললেই চলে। আই লেভেল তাই খুব উপর-নীচ করতে হচ্ছে না।’
পুরুলিয়ার তৃণমূল প্রার্থী শান্তিরাম মাহাতোও বয়েসে প্রবীণ। গরম আর রোদের সঙ্গে পুরুলিয়া শহরাঞ্চলেও এখন অনেক বহুতল। ফলে নেক মুভমেন্টে যে তাঁর সমস্যা হচ্ছে না, এমন নয়। শান্তিরামের কথায়, ‘বিশেষ করে দুপুরের দিকে মাথা, ঘাড়, চোখের আশপাশটা ব্যথা হচ্ছে। তবে আমরা তো সারা বছরই রাস্তায় দাঁড়িয়ে রাজনীতিটা করি, তাই কাহিল হয়ে পড়ি না।’ উত্তর কলকাতার বিজেপি প্রার্থী তাপস রায় বলছেন, ‘৫২ বছরের রাজনৈতিক জীবনে গরমে ভোট প্রচুর হয়েছে। অভ্যাসটাই কাজে লাগছে। আর কর্মীরা আমায় সব সময়েই ঘিরে থাকেন। ওঁরাও আমার রক্ষাকবচ।’
সমস্যা শুধুই প্রবীণদের নাকি নবীনদেরও হচ্ছে? যাদবপুরের বাম প্রার্থী সৃজন ভট্টাচার্যের কথায়, ‘চোখে রোদ লেগে ধাঁধা লেগে যেতে পারে। মাথা, ঘাড়ে ব্যথাও হয়। তবে বেশি পাত্তা দিলে চলে নাকি!’ পাত্তা না দিলে কিন্তু সমস্যা জটিল হতে পারে বলেই মনে করছেন চিকিৎসকেরা। নিউরো মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অনিমেষ করের সতর্কবার্তা, ‘নেক মুভমেন্টের জন্য যদি মাথা ঘুরে যায় বা ব্যালান্স হারিয়ে ফেলেন বলে মনে করেন, তা হলে সেটা নিয়ে যেমন উদ্বিগ্ন হয়ে লাভ নেই, তেমনই এটাকে পাত্তা না দেওয়ার অর্থ আরও বড় সমস্যা ডেকে আনা।’
চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ হিমাদ্রি দত্তর এই সমস্যা রুখতে পরামর্শ, ‘রোদ চশমা পরা ভালো। তবে তা পরা না গেলে, টুপি রাখা যেতেই পারে। প্রচারের মাঝে চোখে ঠান্ডা জলের ঝাপটা দিলে আরাম মিলবে।’ ইএনটি বিশেষজ্ঞ দ্বৈপায়ন মুখোপাধ্যায়ের কথায়, ‘আমাদের শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করে কান। আসলে অন্তঃকর্ণ। দুই অন্তঃকর্ণের মধ্যে থাকা ইউস্টেশিয়ান টিউব থাকে। তার ভিতরে থাকে এক রকমের ফ্লুইড। সেটির স্থিতাবস্থাই ভারসাম্য রক্ষার সূচক। তবে হাঁটতে থাকা অবস্থায় ক্রমাগত ঘাড় উপর-নীচ-ডানে-বাঁয়ে ঘোরালে, কানের ভিতর চলকে ওঠে ওই ফ্লুইড। ফলে শরীরের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়। তখনই মাথা ঘোরার অনুভূতি দেখা দেয়। একই কারণে ভূমিকম্পের সময়ে মাথা ঘোরে।’