• করোনা আর ঘূর্ণিঝড়েই বাদাবনে মৃত্যুমুখে ওঁরা
    এই সময় | ২৬ নভেম্বর ২০২১
  • এই সময়, গোসাবা: বাদাবনে বাঘের হানা নতুন কিছু নয়। কিন্তু তা বলে গত দেড় বছরে হামলার সংখ্যা ৫০ ছাড়াবে?

    কেনই বা জঙ্গলের বিরাট অংশ নাইলন ফেন্সিংয়ে ঘেরা হলেও বাঘের হানায় প্রাণ হারাবেন অন্তত ২৪ জন?

    প্রশ্ন উঠছেই, কারণ গত এক দশকে সুন্দরবনে বাঘ-মানুষ সংঘর্ষের ঘটনা ক্রমশ নিম্নমুখী হচ্ছিল। হঠাৎ তা আবার বাড়তে শুরু করেছে। কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, প্রধান প্রতিকূলতা দুটি। একদিকে করোনা, অন্য দিকে ঘূর্ণিঝড়। এই দুইয়ের দাপটে দিশাহারা সুন্দরবনের প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষ।

    করোনা কেড়েছে পেটের ভাত। লকডাউনে কাজ হারিয়ে দলে দলে ঘরে ফিরেছেন পরিযায়ী শ্রমিকরা। তাঁদের সবাই পরে আর চেনা কাজে ফিরতে পারেননি। আর গত তিন বছরে পরের পর ঘূর্ণিঝড় উজাড় করেছে মাথার ছাদ। বুলবুল, উম্পুন আর ইয়াসের দাপটে ঢোকা সমুদ্রের নোনা জল আর হাওয়া নষ্ট করেছে বিঘার পর বিঘা চাষের জমি।

    ফল? আয়ের বিকল্প সন্ধানে প্রাণ হাতে করেও জঙ্গলমুখী হয়েছেন ঝড়খালি, গোসাবা, কুলতলি, বাসন্তী, রায়দিঘী, পাথরপ্রতিমা-সহ প্রত্যন্ত এলাকার বহু মানুষ। মধু সংগ্রহে, মাছ, কাঁকড়া ধরতে ছোট নৌকো, ডিঙি বেআইনি ভাবে ঢুকে পড়ছে বাঘের ডেরায়, তা-ও একেবারে নিষিদ্ধ কোর এরিয়ায়। সুন্দরবনের কাঁকড়া ইতালি, চিন, জাপান, ভিয়েতনাম-সহ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রচুর মূল্যে বিক্রি হয়। তাই ভালো পরিমাণে তা ধরতে পারলে ঠিকঠাক আয়ও নিশ্চিত। সেই কাজই ডেকে আনছে মৃত্যু। কপাল ভালো হলে বেঁচে ফিরছেন জেলেরা। আর মন্দ কপালে পড়ে যাচ্ছেন বাঘের কবলে।

    সুন্দরবন ব্যাঘ্র প্রকল্প সূত্রে জানা যাচ্ছে, ২০২০ মার্চে লকডাউন শুরুর পর থেকে গত বছর বাঘের হামলায় মারা গিয়েছেন অন্তত ১৩ জন। এ বছর সংখ্যাটা এখনও পর্যন্ত ১১। অথচ হাতেগোনা দু'একটি ঘটনা বাদ দিলে কোথাওই লোকালয়ে বাঘের হানা হয়নি। উল্টে দেখা যাচ্ছে, জঙ্গলে বাঘের হানায় মৃতদের সিংহভাগই ছিলেন সেই গোসাবা ব্লকের বাসিন্দা, যেখানে জনজীবন সবথেকে বেশি বিপর্যস্ত হয়েছে ঘূর্ণিঝড়ে।

    গোসাবার লাহিড়ীপুর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকারই ১৫ জন মারা গিয়েছেন বাঘের আক্রমণে। গত সপ্তাহে ওই এলাকার চরঘেরি গ্রামের ধীবর হাজারি মন্ডল (৬৯) ছেলে চিত্তর সঙ্গে গিয়েছিলেন ঝিলা জঙ্গল লাগোয়া খাঁড়িতে কাঁকড়া ধরতে। সেখানে ছেলের চোখের সামনে বাবাকে বাঘ ধরে নিয়ে যায় জঙ্গলে। শুধু হাজারি নন, ওই এলাকার সুজিত মণ্ডল, যামিনী মিস্ত্রী, রঞ্জিত হালদার, সুশান্ত মণ্ডল, ধরণী মণ্ডলদের প্রাণ গিয়েছে বাঘের হামলায়। একই ভাবে ঝড়ে বিধ্বস্ত কুমিরমারি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার প্রায় দশ জন ধীবরের মৃত্যু হয়েছে বাঘের হানায়। মৃত্যু হয়েছে ছোট মোল্লাখালি, সাতজেলিয়া, বালি ১ নম্বর পঞ্চায়েত এলাকার ধীবরদের। এই সব এলাকার ঘরবাড়ি ও চাষজমি উম্পুন ও ইয়াসে বিধ্বস্ত। ফলে বাঘের সাথে লড়াই করেই বাঁচার চেষ্টা চালাচ্ছেন অনেকে।

    কেন গভীর জঙ্গলে ও কোর এরিয়ায় ধীবরদের যাওয়া বন্ধ করা যাচ্ছে না?

    সুন্দরবন ব্যাঘ্র প্রকল্পের উপ ক্ষেত্র অধিকর্তা জোন্স জাস্টিনের কথায়, 'মানুষকে নির্দিষ্ট কিছু নদীতে মাছ-কাঁকড়া ধরার জন্য আমরা অনুমতি দিই। তা সত্ত্বেও অনেকে লুকিয়ে নিষিদ্ধ এলাকায় চলে যাচ্ছেন এবং নিজেদের বিপদ ডেকে আনছেন। এ ভাবে তো নজরদারি চালানো অসম্ভব। তবু সচেতনতামূলক প্রচার চালানো হচ্ছে।'

    সুন্দরবনে বাঘের খাদ্যের ঘাটতির কথাও বলছেন অনেকে। তাই কি এত বেশি ধীবর হামলার মুখে পড়ছেন? প্রাক্তন সুন্দরবন উন্নয়নমন্ত্রী কান্তি গঙ্গোপাধ্যায়ের কথায়, 'মানুষ কাজ হারিয়ে আরও বেশি করে মাছ-কাঁকড়ার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। বাঘের খাদ্যেও ঘাটতি আছে নিশ্চয়ই। নইলে তারা হামলা করবে কেন। রাজ্য সরকারের এটা দেখা প্রয়োজন।'

    দীর্ঘদিন সুন্দরবনের বাঘ বাঁচাও আন্দোলনে যুক্ত জয়দ্বীপ কুণ্ডু যদিও বলছেন, 'আর্থসামাজিক দিক থেকে অনগ্রসর সুন্দরবনবাসী। ফলে চিরাচরিত ভাবেই জঙ্গল নির্ভরতা এখানে বেশি। বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি না-হলে সেটা তো বাড়বেই। বরং বিকল্প কাজ পেলে মানুষও বাঁচবে। বাঘও নিজেদের নিরাপদ মনে করবে।'
  • Link to this news (এই সময়)