• বর্তমান | ২৬ নভেম্বর ২০২১
  • ফিরদৌস হাসান, শ্রীনগর: পশমিনার প্রেমে কে না মজেছেন! সম্রাট আকবর থেকে হিউয়েন সাঙ, মহারানি ভিক্টোরিয়া থেকে শাহজাদা দারাশুকো। প্রত্যেকেই বারবার আপ্লুত হয়েছেন পশমিনার আদরে। এ তো গেল রাজা-রানিদের কথা। পৃথিবীর নন্দন কানন কাশ্মীরে পা রেখে আমজনতার মনও উথালপাথাল করে পশমিনার জন্য। কেনার সাধ্য না থাকুক, ভূস্বর্গের এই সম্পদকে একবার নিজের চোখে দেখতে কিংবা হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে মন জুড়াতে চান প্রত্যেকেই। বিশ্বের আর কোথাও এমন শাল মেলে না যে! কিন্তু আভিজাত্য ও সূক্ষ্ম কারুকার্যের মেলবন্ধনের সাক্ষ্য বহন করা পশমিনা আজ প্রবল সঙ্কটের মুখে। আর এর পিছনে রয়েছে দক্ষ কারিগরের পাশাপাশি উপযুক্ত যন্ত্রাংশের অভাব। 

    কাশ্মীরের মাইনাস ৩০ ডিগ্রিতে তুরতুর করে ঘুরে বেড়ায় ক্যাশমিয়ার ছাগল। চ্যাংপা যাযাবররা চিরুনি দিয়ে তাদের বাড়তি পশম ঝরিয়ে আনেন। রিফুকার চরকা কেটে তৈরি করেন পশমিনা উল। সাধারণ সুতোর চেয়ে ছ’গুণ পাতলা, তিনগুণ গরম। যত ভালো পশমিনা, তত মিহি ও উষ্ণ। ৫০ হাজার থেকে শুরু করে ভালো পশমিনার দাম ছাড়িয়ে যায় এক লাখও। যত্নআত্তি করলে অনায়াসে পশমিনার যৌবন ছুঁতে পারে সেঞ্চুরি। কিন্তু সেই শিল্পই আজ হারিয়ে যাওয়ার মুখে এসে দাঁড়িয়েছে কেন? 

    যাঁদের হাতের ছোঁয়ায় মোলায়েম ও অনবদ্য হয়ে ওঠে পশমিনা, গোটা উপত্যকায় সেই শিল্পীরই বড় অভাব। একদিকে প্রবল পরিশ্রম, সঙ্গে আজকাল চাহিদাও কমছে। ফলে পূর্বপুরুষের এই পেশা থেকে মুখ ফেরাচ্ছেন বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই। যদিও বা কারিগরের দেখা মেলে, অভাব রয়েছে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের। পশমিনা তৈরির পর তার গা থেকে বাড়তি সুতো ঝরিয়ে মসৃণ করে তুলতে শিল্পীরা হস্তচালিত এক ধরনের যন্ত্র ব্যবহার করেন। লোহার তৈরি ওই যন্ত্রাংশকে স্থানীয়রা বলে থাকেন ‘ওউচ’। সবাই এই যন্ত্র তৈরি করতে পারেন না। উপত্যকায় ‘ওউচ’ তৈরির একমাত্র দক্ষ কারিগর হিসেবে নাম রয়েছে নওয়াকাদাল এলাকার সওকত আহমেদ আহাগড়ের। কিন্তু ৩৫ বছরের ওই যুবকও সম্প্রতি ব্যাঙ্কে চাকরি পেয়ে যাওয়ায় আর ওই যন্ত্র তৈরি করছেন না। বন্ধ করে দিয়েছেন তাঁর কামারশালা। ফলে সঙ্কট বেড়েছে। কাশ্মীরের হস্তশিল্প দপ্তরের আধিকারিক মাহমুদ আহমেদ শাহ অবশ্য পশমিনা শিল্পের সঙ্কট দূর করার আশ্বাস দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, বিকল্প কোনও মেশিনের সাহায্যে সমস্যা মেটানো যায় কি না দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি যাঁরা ‘ওউচ’ তৈরিতে দক্ষ, তাঁরা যাতে ওই যন্ত্র তৈরির ব্যাপারে প্রশিক্ষণ দেন, তারও চেষ্টা চলছে। 

    ২৮ বছরের যুবক আমির নাজির ওয়ানি একজন পশমিনা শিল্পী। আক্ষেপের সঙ্গে বললেন, প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ছাড়া কোনওভাবেই ভালো পশমিনা তৈরি সম্ভব নয়। বাবা, মা ও বোনকে নিয়ে সংসারের ভার তাঁর কাধে। দশম শ্রেণিতে পড়তে পড়তেই স্কুল ছাড়েন। পরিবারের সদস্যদের মুখে ভাত তুলে দিতে পশমিনা তৈরির কাজে যুক্ত হন। কিন্তু তিনিই আজ এই শিল্পের ভবিষ্যত নিয়ে যার পরনাই চিন্তিত। ওয়ানির কথায়, আমার কাছে একটি পুরনো ‘ওউচ’ রয়েছে। নতুন আর একটি যন্ত্র দরকার। কিন্তু বহু চেষ্টা করেও পাচ্ছি না। কেউ বানাচ্ছেন না। 

    বাবা-ঠাকুরদার কাছ থেকে পশমিনা তৈরির কাজ শিখেছেন সুশীল আহমেদ। উপযুক্ত যন্ত্রাংশের অভাবে বাধ্য হয়ে কাজ ছেড়েছেন। এখন শ্রমিকের কাজ করেন দৈনিক সাতশো টাকা মজুরিতে। কারিগরের এই সঙ্কটের কথা সরকারের নজরে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পশমিনা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন মহল। 
  • Link to this news (বর্তমান)