• কলকাতাকে আমি আগের চেয়ে অনেক সুন্দর দেখি, লিখলেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
    আনন্দবাজার | ২৬ নভেম্বর ২০২১
  • কলকাতা আমার জন্মশহর নয় বটে, কিন্তু চার বছর বয়সে কলকাতাকে সেই যে ভাল লেগেছিল, তার রেশ আজও ভীষণ ভাবে আছে। যদিও বহু দিন কলকাতা-ছাড়া হয়ে নানা জায়গায় ঘুরতে হয়েছে। চুয়ান্ন সালে দীর্ঘ অদর্শনের পরে আবার কলকাতায় এসে যখন কলেজে ভর্তি হলাম, তখন আমার ‘আঠেরো বছর বয়স ভয়ঙ্কর’।পরিসর কম, সবুজের অবুঝ অভাব, বড্ড শান বাঁধানো, বড্ড উদাসীন, বড্ড ভিড়, বড্ড গলিঘুঁজির এই শহরকে তবু কেন যেন বেশ ভালই লাগল আবার, নতুন করে। শহরের উত্তরে কলেজ হস্টেলে বাস। পকেটে টান, তাই হেঁটেই কলকাতার গলিঘুঁজি চিনে নিচ্ছি তখন। বাস বা ট্রামভাড়া বাঁচানোর উপায় ছিল হাঁটা আর হাঁটা। আর তাতে আমার আলস্য ছিল না। কলকাতা তখন তেমন সুন্দর নয়, কিন্তু তার নানা আকর্ষণ। কফি হাউস, কলেজ স্ট্রিট বইপাড়া, ময়দানে খেলার মাঠ, ইডেন, স্টার থিয়েটার, জোড়াসাঁকোয় রবীন্দ্রনাথের বাড়ি, মিউজ়িয়াম, চিড়িয়াখানা, ট্রাম, তেলেভাজা, ফুচকা, সেনেট হল, মেট্রো সিনেমা। জলাশয় দেখতে হলে হেদো বা গোলদিঘি বা ঢাকুরিয়া লেক। আর মা গঙ্গা। রাস্তায় বড় বা ছোট-বাইরে পেলেই বিপদ। পুরুষদের চেয়েও বেশি বিপদ মেয়েদের। দু’চারটে যা পাবলিক টয়লেট তখন ছিল, তা এতই নোংরা যে, ব্যবহারযোগ্যই নয়। মফস্‌সলের মতো মাঠঘাট তো নেই।১৯৫৪ থেকে ২০২১ অবধি কলকাতা কিন্তু অনেক বদলে গেছে। সাতষট্টি বছর তো কম সময় নয়। কিন্তু বদলটা এত দিন ধরে এবং ধীরে ধীরে হয়নি। আমি কলকাতাবাসী হওয়ার পরে শহরটা দীর্ঘ দিন প্রায় একই রকম ছিল। শহরতলির দিকে বসত বৃদ্ধি আর শহরে কিছু বহুতল ছাড়া বিশেষ উন্নতি দেখিনি। বরং গাছপালা কাটা পড়ছিল, ঘাসজমি, জলাশয় উধাও হচ্ছিল। এত সুন্দর কালীঘাট পার্কটা চোখের সামনে নেড়া, শ্রীহীন তো হলই, খানিকটা কেটে একটা প্রেক্ষাগৃহও হয়ে গেল কেন কে জানে! কার্জন পার্কের মতো এত সুন্দর একটা পার্ককে ট্রামলাইন দিয়ে কাটাকুটি করে, শান বাঁধিয়ে কী ভাবে যে মেরে ফেলা হল, তা কহতব্য নয়। ট্রামলাইনের যে রোম্যান্টিক ঘাসের বিছানা ছিল নানা জায়গায়, তা শানে বাঁধিয়ে চক্ষুপীড়া সৃষ্টি করা হল। বিদেশের বিভিন্ন শহরে দেখেছি, কত দূরদৃষ্টিসম্পন্ন পরিকল্পনা করে শহর তৈরি হয়েছে। কত গাছপালা, প্রত্যেক বাড়ির লাগোয়া বাধ্যতামূলক লন এবং খোলা পরিসর। দমবন্ধকারী কিছু নেই। লন্ডন কলকাতার চেয়ে বয়সে অনেক বুড়ি, কিন্তু যৌবনের টক্করে কলকাতাকে দশ গোল দিতে পারে।

    কিন্তু এ নিয়ে দুঃখ করে লাভ নেই। এই বুকচাপা শহরকেই তো আমরা চিরকাল ভালবেসেছি। দুঃখ হত এই ভেবে যে, কলকাতার শ্রী ফেরানোর চেষ্টা কেউ কখনও করে না। কলকাতা যেন ভাগের মা। তবে সেই আক্ষেপটা এখন ততটা নেই। গত এক-দেড় দশকে কলকাতার যে পরিবর্তন হয়েছে, তা আমাদের অনেক দীর্ঘশ্বাস হরণ করেছে নিঃসন্দেহে। তারও আগে এসেছে পাতাল রেল, যা কলকাতাকে দিয়েছে বেগ ও আবেগ। এল উড়ালসেতু, এল চমৎকার সব মল। কালক্রমে ভদ্রস্থ এক জনপদ তৈরি হয়েছিল, সল্টলেক সিটি। ভারী পরিচ্ছন, সপরিসর জনপদ। তাকেও টেক্কা দিয়েছে রাজারহাট আর নিউ টাউন। গেলে চোখ জুড়িয়ে যায়। আগে কলকাতার সরকারি হাসপাতালে ঢুকলে পূতিগন্ধে নাকে চাপা দিতে হত। এখন ভারী ঝকঝকে পরিষ্কার। তবে বেসামাল রোগীর ভিড় সামলাতে পরিকাঠামোর বিস্তারও দরকার।খুব নিন্দুকের চোখ নিয়ে দেখলেও কলকাতাকে আমি আগের চেয়ে অনেক সুন্দর দেখি। রাস্তাঘাট অনেকটা পরিচ্ছন্ন, আবর্জনা অনেকটাই উধাও, পে-টয়লেটের ব্যবস্থাও হয়েছে। তবে হ্যাঁ, একটু বেশি বৃষ্টি হলেই রাস্তায় জল জমার বিপদ বেড়েছে। আরও গুটিকয় ফ্লাইওভার হলে হয়। আর পার্কগুলোর সংস্কারও বড্ড দরকার। কয়েকটা বাজার এখনও মান্ধাতার আমলের চেহারা নিয়ে পড়ে আছে, যেমন যোধপুর পার্ক বাজার। কলকাতাকে ভালবাসলে এ সব কাজ ঠিকই হয়ে যাবে। মনে হয়, কলকাতাকে ভালবাসার লোকের অভাব হবে না।

  • Link to this news (আনন্দবাজার)