সঞ্জিত সেনগুপ্ত, শিলিগুড়ি: সোমবার রাঙাপানিতে মর্মান্তিক ট্রেন দুর্ঘটনায় জখম যাত্রীদের অনেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গিয়েছেন। বাকিরা সুস্থ হয়ে উঠছেন। কিন্তু কেউই দুর্ঘটনার ভয়ঙ্কর স্মৃতি ভুলতে পারছেন না। হাসপাতালের বেডেও তাঁদের সেই আতঙ্ক তাড়া করে বেড়াচ্ছে।
উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত ৩৬ জন জখম ট্রেনযাত্রী চিকিৎসাধীন ছিলেন। সকালে একজনের ছুটি হয়েছে। তিনজনের চোট গুরুতর। বাকিদের অনেকেরই এক-দু’দিনের মধ্যে ছুটি হবে বলে জানান উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সুপার সঞ্জয় মল্লিক।
এদিকে, হাসপাতালের বেডে শুয়ে সেই স্মৃতি ভাবতে গিয়ে আঁতকে উঠেছেন কৃষ্ণনগরের বিশ্বনাথ শর্মা। এদিনও তাঁর কাটেনি আতঙ্ক। তিনি বলেন, অসম থেকে বাড়ি ফিরছিলাম। কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেসের পিছন থেকে তিন নম্বর কোচে ছিলাম। এনজেপি স্টেশন ছাড়ার পর জানালার ধারে বসে বৃষ্টিতে বাইরের দৃশ্য দেখছিলাম। হঠাৎ একটা ধাক্কায় ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল আমাদের কামরা। তারপর দু’ধারে দেওয়াল, সিট আমাকে দু’দিক দিয়ে চেপে ধরে। উপরে তাকাতেই দেখি, কামরার সিলিংয়েরর একটি অংশ তিন ভাগ হয়ে ত্রিশূলের মতো আমার বুকের উপর নেমে আসছে। সঙ্গে সঙ্গে দু’হাত দিয়ে তা ঠেকানোর চেষ্টা করি। তাতে একটা রড ধরতে ফেলি। সেই রড ধরে এক ঝটকা মেরে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করলাম। তারপর আর কিছু মনে নেই। যেভাবে সিলিং ভেঙে লোহার পাত নেমে আসছিল, তাতে আমি বের হতে না পারলে ওই ধারালো পাত বুকে গেঁথে যেত। আর বুকে গাঁথলে নিশ্চিত মৃত্যু ছিল। কিছুতেই ভুলতে পারছি না সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্য।
তাঁর পাশের বেডে রয়েছেন শিলিগুড়ির রানিডাঙার রূপম ঘোষ ও তার বাবা বিশ্বনাথ ঘোষ। মা দীপা ঘোষও দুর্ঘটনায় জখম হয়ে ফিমেল সার্জিক্যাল ওয়ার্ডে ভর্তি। ১০ বছরের রূপমকেও তাড়া করে বেড়াচ্ছে আতঙ্ক। মালদহে মামার বিয়েতে যাচ্ছিল তারা। এদিন রূপম বলে, ঘুমিয়েছিলাম। হঠাৎ একটা ঝাঁকুনিতে মেঝেতে পড়ে যাই। চারদিকে চিৎকার। তাকিয়ে দেখি, বাবা চোখ বন্ধ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। আমি চিৎকার করে বলি, বাবা মারা গিয়েছে। সেই চিৎকার শুনে বাবা চোখ মেলে তাকায়। তারপর বাবা উঠে প্রথমে আমাকে টেনে তোলে। পরে মাকে বের করে আনে। ট্রেনের ভিতরে গিয়ে আরও কয়েকজন শিশুকে বাবা বের করে। চারদিকে চিৎকার, কান্না। সবাই রক্তাক্ত অবস্থায় পড়েছিল। ভাবলেই ভয় হচ্ছে। এদিকে এদিন সকাল হতেই জখম ট্রেন যাত্রী ও মৃতের পরিবার লোকেরা উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভিড় করতে শুরু করেন। কেউ হাসপাতালের বেডে প্রিয়জনকে শুয়ে থাকতে দেখে ডুকরে কেঁদে ওঠেন। কেউবা প্রিয়জনের মৃতদেহ নিয়ে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করেন মর্গের সামনে। ময়নাতদন্তের পর একে একে মৃতদেহ পরিজনরা নিয়ে যান। সেই অপেক্ষায় ছিলেন উত্তর দিনাজপুর জেলার গোয়ালপোখরের শাহজাত রাম। তাঁর ভাই অর্জুন রাম (১৮) সোমবার অভিশপ্ত কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেসের যাত্রী ছিলেন। শাহজাত বলেন, ভাই অসমে কাজ করত। ছুটি পেয়ে বাড়ি ফিরছিল। ওর মৃতদেহ বাড়ি ফিরবে ভাবতেই পারছি না।