• লাইনে কাঞ্চনজঙ্ঘা, ছাড়পত্র মালগাড়িকে, বিনা তদন্তে চালককে দায়ী করায় প্রশ্নে রেল
    বর্তমান | ২০ জুন ২০২৪
  • নিজস্ব প্রতিনিধি, নয়াদিল্লি, শিলিগুড়ি ও কলকাতা: স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ব্যবস্থা কাজ করছে না। টিএ-৯১২ ফর্ম দিয়ে রওনা করা হয়েছে কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেসকে। নির্দিষ্ট গতিবেগ মেনে সেটি রাঙাপানি স্টেশন থেকে রওনা দিয়েছে। চালক জানেন, আগের ন’টি সিগন্যাল তিনি সবুজ পাবেন। তবে প্রত্যেক সিগন্যালে তাঁকে এক মিনিট করে দাঁড়িয়ে তারপর এগতে হবে। কিন্তু তাঁর জানা ছিল না, কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেসের ঠিক পিছনে একই লাইনে এসে পড়েছে একটি মালগাড়ি। কীভাবে এল সেটি? কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস লাইনে আছে জানা সত্ত্বেও কোন ফর্ম দিয়ে এবং কোন ঝুঁকিতে মালগাড়িটিকে ছেড়ে দিলেন রাঙাপানির স্টেশন ম্যানেজার। তদন্তে নামার পর এটাই প্রাথমিক প্রশ্ন কমিশনার্স অব রেলওয়ে সেফটির (সিআরএস)। সবচেয়ে বড় কথা, কাঞ্চনজঙ্ঘাকে টিএ-৯১২ ফর্মে ছাড়পত্র দেওয়ার পর মালগাড়িকে কখনওই ওই একই ফর্ম দেওয়ার কথা ছিল না স্টেশন ম্যানেজারের। বরং রেল সূত্রে জানা যাচ্ছে, মালগাড়ির চালকের জন্য বরাদ্দ হওয়া উচিত ছিল টিডি-৯১২ ফর্ম। কারণ, এতে স্পিড লিমিটের উল্লেখ থাকে। আগের ট্রেনের সঙ্গে নির্দিষ্ট দূরত্ব এবং বেঁধে দেওয়া গতিবেগ মেনেই তাহলে চলত মালগাড়িটি। তা কিন্তু হয়নি। মালগাড়ির চালক তাতে যদি ভেবে থাকেন, তাঁর সামনে কোনও ট্রেন নেই, তাতে তিনি কোনও ভুল করেননি বলেই খবর রেল সূত্রে। আর এখানেই আরও একবার প্রশ্ন উঠছে রেল বোর্ডের চেয়ারপার্সন জয়া ভার্মা সিনহার তড়িঘড়ি ঘোষণা নিয়ে। কারণ, দুর্ঘটনার কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি ঘোষণা করে দিয়েছিলেন, মালগাড়ি চালকের গাফিলতিতেই বিপর্যয় ঘটেছে। বিনা তদন্তে কীভাবে তিনি এই দাবি করে দিলেন, সেই প্রশ্নে এখন প্রবল অস্বস্তিতে রেল। কেন্দ্রের বিড়ম্বনা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বিষয়টি নিয়ে চেয়ারপার্সনের সঙ্গে একপ্রস্থ বৈঠকও করেছেন রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব। কারণ তিনিও জানেন, মালগাড়ির চালক নন, দুর্ঘটনায় স্পষ্ট হয়ে উঠছে রেলের গাফিলতি।


    দুর্ঘটনার যোগসূত্র তিনটি—১) অকেজো স্বয়ংক্রিয় সিগন্যালিং ব্যবস্থা, ২) একই লাইনে দু’টি ট্রেন ৩) কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস ও মালগাড়ি, দু’টিকেই একই ফর্মে ছাড়পত্র দেওয়া। উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলের ডিআরএম (কাটিহার) সুরেন্দ্র কুমার এদিন বলেছেন, ‘বজ্রবিদ্যুত্ সহ বৃষ্টিপাতের জন্য সিগন্যালিং ব্যবস্থা বিকল হয়েছিল। তার পরের ঘটনা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’ কোন পথে এগচ্ছে সেই তদন্ত? ইতিমধ্যে চিফ কমিশনার অব রেলওয়ে সেফটি (সিসিআরএস) জনককুমার গর্গ তদন্তে নেমেছেন। ঘটনাস্থল থেকে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে বিভিন্ন নথি। সংশ্লিষ্ট টিএ-৯১২ ফর্মের কপিও হাতে এসেছে সিআরএসের। তদন্তকারী অফিসাররা বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন। প্রথমত, কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস নিজবাড়ি স্টেশন ছেড়ে যাওয়ার আগে পর্যন্ত রাঙাপানি স্টেশন থেকে নড়ার কথা নয় মালগাড়ির। সেটি কীভাবে স্বাভাবিক গতিতে ছুটতে শুরু করল? দ্বিতীয়ত, মালগাড়ির কি আপৎকালীন ব্রেক কষার কোনও সুযোগ ছিল না? তৃতীয়ত, এএস-৬৫৪ ও এএস-৬৫২ সিগন্যালের মধ্যবর্তী লেভেল ক্রসিংয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী কি রুখতে পারতেন দুর্ঘটনা?


    সিসিআরএস এদিন বলেন, ‘তদন্তে সবদিক গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। ইতিমধ্যে সমস্ত রেকর্ড সিল করা হয়েছে। তদন্তের পর সবটা বোঝা যাবে।’ এদিন এনজেপিতে সেফটি কমিশনারের অফিসে তদন্ত কমিশন বসেছে। রেল সূত্রে খবর, লোকো পাইলট, অ্যাসিস্ট্যান্ট লোকো পাইলট, মালগাড়ির ট্রেন ম্যানেজার, পি ম্যান, রাঙাপানি ও চটেরহাট স্টেশনের মাস্টার, সেফটি বিভাগের কর্মী সহ ৩০ জনকে তলব করা হয়েছে। ডিআরএমের (কাটিহার) সঙ্গে কথা বলেছেন সেফটি কমিশনার। নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনের জিআরপিতে কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেসের এক যাত্রী অভিযোগ করেছেন। তাই তদন্তে নামছে রেলপুলিসও। এই ঘটনায় অনিচ্ছাকৃত খুনের ধারায় মামলা রুজু করে রেলকে চিঠি দিচ্ছে তারা। জানতে চাওয়া হচ্ছে, রাঙাপানি স্টেশনে কারা দায়িত্বে ছিলেন? মালেগাঁওতে শীঘ্রই ডিআরএম রিপোর্ট পেশ করবেন। 
  • Link to this news (বর্তমান)