ডিব্রুগড় থেকে ছুটিতে বনগাঁয় বাড়ি ফিরছিলাম। একটি বেসরকারি সংস্থার ইঞ্জিনিয়ার আমি। অসমে পোস্টিং। রবিবার কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেসে চেপেছিলাম। এস-৫ কোচে আপার বার্থে আমার আসন ছিল। বাড়ি ফেরার আনন্দ ছিল। রাতে বেশ ভালোই ঘুমিয়েছি। ভোরবেলা দেখি, বৃষ্টি পড়ছে। উপরের আসন থেকে নীচে নেমে সিটে এসে বসে ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখছিলাম। এনজেপি ছাড়ার কিছু পরই আচমকা বিকট শব্দ হয়। মারাত্মকভাবে দুলে ওঠে কোচ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই কোচের মধ্যে অন্যান্য যাত্রীদের মতোই ছিটকে পড়ি। তারপরই চারদিক দিকে ভেসে আসে আর্তনাদ, চিৎকার ও কান্না। আমাদের বগি লাইনের বাইরে গিয়ে হেলে পড়ল। ধাক্কা খেয়ে আমার সারাশরীরে তখন প্রচণ্ড যন্ত্রণা হচ্ছে। ঘোর কাটিয়ে উঠতে পারছি না।
তখনও বুঝিনি কী হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে কিছুক্ষণ বাদেই সহযাত্রীদের মধ্যে থেকে একজন জানালেন, ট্রেন দুর্ঘটনা হয়েছে। পিছন থেকে একটি মালগাড়ি এসে সজোরে ধাক্কা মেরেছে আমাদের ট্রেনকে। যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু পারলাম না। কিছুক্ষণ পর স্থানীয় কিছু মানুষ এসে আমাকে ট্রেনের ভিতর থেকে উদ্ধার করলেন। অ্যাম্বুলেন্সে চাপিয়ে আমাকে নিয়ে আসা হল উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। এখনও মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা।
কিন্তু আমি একটা কথা ভাবছি, কী করে বেঁচে ফিরলাম! যেভাবে আমাদের বগি দুলে উঠে হেলে পড়ে, কামরার মধ্যে ছিটকে পড়ি, তাতে মারা যাওয়ারই কথা। চোখের সামনে দেখলাম, আমার সহযাত্রীরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রয়েছেন। সকলেই রক্তাক্ত ও ছটফট করছেন। অনেকে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পড়ে রয়েছেন। হয়তো মারা গিয়েছেন। ওই দৃশ্য দেখে বুঝি, মৃত্যু আমার মাথার কাছে এসেও ফিরে গিয়েছে। এটা মনে পড়লেই আঁতকে উঠছি। সেই সঙ্গে এটাই ভেবে চলেছি, কী করে বেঁচে ফিরলাম!