• বেউর জেলে বসেই ১০ ‘বিশ্বাসঘাতক’ সহযোগীকে খতম করেছে ডন সুবোধ
    বর্তমান | ২০ জুন ২০২৪
  • দেবাঞ্জন দাস, কলকাতা: বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি একটাই—মৃত্যু! সুবোধ সিংয়ের গ্যাং-এ এটাই অলিখিত নিয়ম। দেশজুড়ে তিন-চারটি স্বর্ণবিপণি ও স্বর্ণ ঋণদানকারী সংস্থাকে টার্গেট করে ফি বছর ‘লুটপাট’-এর প্ল্যান জেলে বসেই বানায় এই ‘জুয়েল থিফ’। পাশাপাশি ‘অবাধ্য’, ‘বিশ্বাসঘাতক’দের তালিকা তৈরি করে নিকেশ অভিযানও চালায়। আর যাবতীয় পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয় বিহারের বেউর সেন্ট্রাল জেলে, সেক্টর-৩’এর ২২ নম্বর ওয়ার্ডের ‘আরামঘরে’। হাজিপুরের গঙ্গা ব্রিজ থানা এলাকার বাসিন্দা আতিক রহমান (নাম পরিবর্তিত) সুবোধ গ্যাংয়ের প্রাক্তন সদস্য। রাজস্থানের জয়পুরে ‘অপারেশন’ চালিয়ে ধরা পড়ার পর জেল খেটে আর গ্যাংমুখো হয়নি সে। আতিকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল ’বর্তমান’। সেই আতিকের কথায়, ‘সোনা লুটের ছক শুধু নয়,  শত্রু নিকেশের ব্লুপ্রিন্টও তৈরি করে সুবোধ নিজে। একজন মানুষ যে কতটা হিংস্র আর প্রতিহিংসাপরায়ণ হতে পারে, ওকে না দেখলে জানতেই পারতাম না। কাউকে রেয়াত করে না, এমনকী বিজেপির প্রভাবশালী নেতার ছেলেকেও নয়।’ বিহার এসটিএফের হিসেব, বেউরের ঘাঁটিতে বসেই গত ছ’বছরে কমপক্ষে ১০ জন ‘বিশ্বাসঘাতক’ সহযোগীকে ‘খতম’ করিয়েছে সুবোধ। একদা দুই ঘনিষ্ঠ শাগরেদকে যে ভাবে জেলে বসেই খুন করিয়েছে সুবোধ, তা রীতিমতো রোমহর্ষক, ভয়ঙ্কর। এরা দু’জনেই পশ্চিমবঙ্গে সুবোধের অপারেশনে অংশ নিত। 


    ‘তোলা’ দিতে অস্বীকার করায় বিহার, ঝাড়খণ্ড, উত্তরপ্রদেশ সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ীকে ‘ভয়’ দেখাতে হামলা চালিয়েছে সুবোধ গ্যাং। সেই তালিকায় সাম্প্রতিক সংযোজন বারাকপুরের বাসিন্দা ব্যবসায়ী অজয় মণ্ডল। এ রাজ্যের সিআইডি কর্তারা বলছেন, এহেন ‘সুবোধ সন্ত্রাস’ বাংলায় দ্বিতীয়বার। এর আগে বারাকপুরের বিরিয়ানি ব্যবসায়ীর উপর হামলা করেছিল তারা।


    ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে বিশ্বস্ত দুই সহযোগী সমেত সুবোধ সিং যখন গ্রেপ্তার হয়, ততদিনে প্রায় ১০০ কেজির সোনা লুট করা হয়ে গিয়েছে। কিছুদিন বাদে ধরা পড়ে তার এক ঘনিষ্ঠ শাগরেদ মণীশ কুমার ওরফে তেলিয়াও। তাকে ‘ম্যানেজ’ করে নেয় পুলিস। রাজসাক্ষী হওয়ার শর্তে সুবোধের সোনা মজুতের এক গোপন ভাণ্ডারের হদিশ এবং গ্যাংয়ের কয়েকজন সদস্যকে ধরিয়েও দেয় তেলিয়া। বেউর থেকে দূরে হাজিপুর জেলে ঠাঁই হয় তার। এসটিএফের এক প্রাক্তন কর্তার কথায়, ‘এই বিশ্বাসঘাতকতায় ক্ষিপ্ত হয় সুবোধ। তেলিয়াকে খতম করার নির্দেশ দেয়। ২০১৯ সালের গোড়ার দিকে তাকে আদালতে নিয়ে যাওয়ার পথে পুলিসের গাড়িতে হামলা চালায় বন্দুতবাজরা। গুলিবিদ্ধ হলেও প্রাণে বেঁচে যায় তেলিয়া। হাজিপুর জেলে তার নিরাপত্তা আরও বাড়ানো হয়। কিন্তু সুবোধকে থামানো যায়নি। ২০২০ সালের ৩ জানুয়ারি সুবোধের দেওয়া সুপারি নিয়ে রাজাবাবু নামে এক বন্দি গুলি করে খুন করে তেলিয়াকে। কিন্তু প্রমাণের অভাবে সে মামলাতেও জড়ানো যায়নি ‘জুয়েল থিফ’কে। হাজিপুরের এক স্বর্ণ ঋণদানকারী সংস্থা থেকে ৫৫ কেজি সোনা লুট করেছিল সুবোধ গ্যাং। সেই অপারেশনের পর কয়েকজন গ্রেপ্তার হলেও, সোনার হদিশ পায়নি পুলিস। সুবোধের কাছে খবর যায়, জেল থেকে বেরিয়ে হাজিপুরেরই বাসিন্দা, গ্যাংয়ের সদস্য ইউসুফ কৌশল ওরফে হানিরাজ সেই স্বর্ণ ভাণ্ডারের বেশ খানিকটা হাতিয়ে নিয়েছে। গত বছর ১০ সেপ্টেম্বর বাড়ির কাছে সেই হানিরাজকে সাতটি গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেয় ভাড়াটে খুনিরা। 
  • Link to this news (বর্তমান)