নিজস্ব প্রতিনিধি, কোচবিহার: রাজার শহর বলে পরিচিত কোচবিহার। একসময় এখানকার মহারাজাদের উদ্যোগে শহরে সুষ্ঠু নিকাশি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল। কিন্তু সেই নিকাশি ব্যবস্থা বহুদিন আগে ভেঙে পড়েছে। যে কোনও বৃষ্টির দিনে কোচবিহারের গর্ব রাজবাড়ির সামনের রাস্তায় জল থইথই করে। তখন রাজপথকে মনে হয় যেন নদী। এছাড়া রাসমেলার মাঠ, মরাপোড়া এলাকা, কলাবাগান, ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের তোর্সা সংলগ্ন এলাকা, বাসস্ট্যান্ড, খাগড়াবাড়ি সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ে। এই ভোগান্তি বছরের পর বছর ধরে চলছে। অথচ হাতগুটিয়ে বসে পুরসভা। শুধুই আশ্বাস শোনা যায়। কিন্তু বর্ষা পেরলে সমস্যার কথা বেমালুম ভুলে যান পুরকর্তারা। বছরের পর বছর রাস্তার ধারের সরকারি জায়গা দখল করে যত্রতত্র নির্মাণকাজ, অপরিকল্পিতভাবে বাড়িঘর, দোকানপাট গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ। অথচ পুর কর্তৃপক্ষ কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। একইসঙ্গে গড়ে তোলা হয়নি সুষ্ঠু নিকাশি ব্যবস্থা। ফলে শহরের বেহাল নিকাশি নিয়ে অভিযোগের তির পুরসভার দিকেই।
কোচবিহার শহরের গা ঘেঁষে চলে গিয়েছে তোর্সা নদী। শহরের নিকাশি ব্যবস্থা তোর্সা নদীর উপর নির্ভরশীল। পাশাপাশি মরা তোর্সা, তোর্সা সংলগ্ন খাল শহরের নিকাশি ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। শহরের জল বিভিন্ন বড় নালা, স্লুইস গেট দিয়ে বেরিয়ে এসব জায়গায় পড়ে। ফলে তোর্সায় জল বাড়লে বা বাকি জায়গাগুলিতে জলস্তর বৃদ্ধি পেলে শহরের জল সঠিকভাবে বেরতে পারে না। পাড়ার মধ্যে বা রাস্তায় জল আটকে থাকে দীর্ঘ সময়।
বাসিন্দারা বলেন, শহরের নিকাশি ব্যবস্থা উন্নত করতে প্রতিবার বর্ষার সময় শোনা যায় তোর্সায় ড্রেজিং করা হবে। কিন্তু বর্ষা চলে গেলেই সেকথা আর মুখে আনেন না পুরকর্তারা। এক্ষেত্রে ব্যর্থতার দায় পুর কর্তৃপক্ষের উপরেই বর্তাচ্ছে। অন্যদিকে, শহরের মধ্যে ছোট বড় নিকাশি নালাগুলিরও বেহাল দশা। নাব্যতা, ঢাল কোনও কিছুই ঠিক নেই। রাজারা তাঁদের সময়ে সুষ্ঠু নিকাশি গড়ে তুললেও পরবর্তীতে সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেনি পুরসভা। সাফাইয়ের অভাবে সারা বছর ড্রেনগুলি জঞ্জালে ভরে থাকে। আঁতুড়ঘর হয়ে ওঠে মশা, মাছির। ফলে বর্ষায় জল জমার সমস্যা থেকে মুক্তি মেলে না কোচবিহারবাসীর। বাসিন্দাদের বক্তব্য, সামগ্রিক পরিস্থিতিতে পুর কর্তৃপক্ষের অসহায়তা স্পষ্ট।
পুরসভার চেয়ারম্যান রবীন্দ্রনাথ ঘোষ বলেন, শহরের পশ্চিম দিকের স্লুইস গেটগুলি দিয়ে জল যায় না। সেদিকে একটি ক্যানেল রয়েছে। সেটি উঁচু হয়ে গিয়েছে। বৃষ্টি হলে সেখানে জলস্তর বেড়ে যায়। স্লুইস গেট খুলে দিলে উল্টে শহরে জল ঢুকে যায়। বাবুরহাটের মরা তোর্সায় ড্রেজিং না করলে সমস্যা মিটবে না। একইসঙ্গে রাজবাড়ির পিছনের ক্যানেলেও সমস্যা রয়েছে। এ দু’টির সংস্কার প্রয়োজন। তবে এটাও ঠিক, মানুষ যেখানে সেখানে ঘরবাড়ি তৈরি করেছে। এতেও ব্যাহত হচ্ছে নিকাশি।
কোচবিহারকে হেরিটেজ শহর হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে সাগরদিঘি, বৈরাগীদিঘি সংস্কার সহ একাধিক সৌন্দর্যায়নের কাজ হয়েছে। কিন্তু শহরের প্রধান নাগরিক সমস্যা জল জমার সমস্যার সুরাহা হয়নি। পুরসভার তরফে জানানো হয়েছে, নিকাশি ব্যবস্থা ঢেলে সাজার জন্য মাস্টারপ্ল্যান তৈরি হয়েছে। ফান্ডের বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রী কোচবিহারে এসে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন। অনুমোদন মিললেই কাজ শুরু হবে। তবে চলতি বর্ষায় কোচবিহারবাসীর জল জমার সমস্যা থেকে মুক্তি নেই! নিজস্ব চিত্র