• দুবাইয়ে ভিক্ষাবৃত্তিতে মোটা মাইনের টোপ, অসহায় মহিলাদের পাচার
    বর্তমান | ২৪ জুন ২০২৪
  • অভিষেক পাল, বহরমপুর: মাসে ২৫ হাজার টাকা বেতন। প্রতিদিন দু’ঘণ্টা ডিউটি। ‘অফিসে’ নিয়ে যাওয়া হবে গাড়ি করে। থাকা-খাওয়া ফ্রি। বহরমপুরে কলাবাগানের বাসিন্দা বছর পয়তাল্লিশের এক মহিলাকে এমনই টোপ দেওয়া হয়। শুধুমাত্র রাস্তায় বসে ভিক্ষা করলেই এমন লোভনীয় ‘প্যাকেজ’। এমন প্রলোভনেই মাথা ঘুরে যাওয়ার জোগাড়। ফলে সহজেই টোপ গিলে নেওয়ায় মুর্শিদাবাদের মহিলাদের পাচার করা হচ্ছে দুবাইয়ে। এর পিছনে আন্তর্জাতিক পাচার চক্র কাজ করছে বলেই অনুমান পুলিসের। দুবাইয়ে বসেই মুর্শিদাবাদে অপারেট করা হচ্ছে। 


    প্রায় ১০ দিন আগে বহরমপুরের রাঙামাটি চাঁদপাড়া ও গোবিন্দপুর থেকে চার মহিলাকে ফুসলিয়ে কলকাতা নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে বিমানে দুবাই যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু এক যুবকের সঙ্গে চার মহিলাকে দেখে সন্দেহ হয় কলকাতা বিমানবন্দরের ব্যুরো অব ইমিগ্রেশনের (বিওআই) কর্মীদের। তাঁরা ফ্লাইটে ওঠার আগে মহিলাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তিন মহিলা দালালদের শিখিয়ে দেওয়া কথা বললেও এক মহিলা সব ফাঁস করে দেন। তাঁদের ভিক্ষা করানোর জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে শুনে সকলের দুবাই যাওয়ার অনুমোদন বাতিল করে দেন বিওআই আধিকারিকরা। এয়ারপোর্টে ওই আধিকারিকদের কথায় চার মহিলা বুঝতে পারেন যে তাঁদের পাচার করা হচ্ছিল। তাঁরা সেখান থেকে পালানোর চেষ্টা করেন। দু’জন তা পারলেও বাকি দু’জনকে ট্রেনে করে নিয়ে গিয়ে মুম্বইয়ে আটকে রাখে দালালরা। অবশেষে তাঁরাও শনিবার বাড়ি ফিরতে পেরেছেন। এখনও আতঙ্ক কাটছে না তাঁদের। 


    কলাবাগানের এক মহিলা বলেন, আমাদের ভুল বুঝিয়ে প্রথমে কলকাতা নিয়ে যায় পরিচিত এক যুবক। বলল কলকাতা থেকে টিকিট আছে। কিন্তু ওখানে গিয়ে আমরা সব বুঝতে পারি। বাড়ি চলে আসছিলাম। কিন্তু আমাদের মোবাইল টাকা সব নিয়ে নেয়। মুম্বইয়ে নিয়ে যায়। আমাদের ভয় দেখিয়ে বলেছিল, সবাইকে বলবি যে আমরা ঘুরতে যাচ্ছি এবং সামনের মাসে ফিরব। ওখানকার এয়ারপোর্টে নিয়ে গিয়ে টিকিট কাটে। টিকিট কাটার পর চারজনের বাড়ি একই থানা দেখে এয়ারপোর্টে ওদেরও সন্দেহ হয়। টিকিট আটকে দেয়। আমাদের বিক্রি করে দেওয়ার জন্য দুবাইয়ে নিয়ে যাচ্ছিল ওই যুবক। আমাদের ও বলেছিল, প্রতিদিন দুই ঘণ্টার কাজ করলে মাসে ২৫ হাজার টাকা দেবে। একই কথা বলে আরও অনেক মহিলাদের নিয়ে গিয়েছে ওরা। মুম্বইয়ে নিয়ে গিয়ে চারটি জায়গা পরিবর্তন করে লুকিয়ে রেখেছিল। বের হতে দেয়নি। পাঁচদিন ধরে খেতে দেয়নি।


    পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্ণধার মতিউর রহমান বলেন, একেবারে দুবাইতে পাচার করা হচ্ছে। সেখান গিয়ে ২৫ হাজার টাকা মাসে বেতন, থাকা-খাওয়া সবই দেবে পাচারকারীরা। দুবাই যাওয়ার জন্য পাসপোর্ট, ভিসা ও প্লেনের টিকিট করে দিচ্ছে পাচারকারীরাই। মহিলারা টাকার লোভে পাচারকারীদের টোপ সহজেই গিলে নিচ্ছেন। পাসপোর্ট থেকে টিকিট অবধি মাস তিনেকের ধাক্কা। সেই সময় মহিলারা তাঁর স্বামী, ছেলে-মেয়ে কাউকেই জানাচ্ছে না এই টোপের কথা। তারপর একবার পাচারকারীর সঙ্গে ট্রেনে উঠে পড়লেই নানা সমস্যায় পড়ছেন মহিলারা। অনেক কষ্ট করে এই চার মহিলা পালিয়ে আসতে পেরেছেন। যারা এই টোপ দিয়ে পাচার করছে তাদের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
  • Link to this news (বর্তমান)