• ‘মনে বাড়ছে হিংস্রতা, অপ্রাপ্তির আক্রোশ থেকেই একের পর এক গণপ্রহারের ঘটনা’
    বর্তমান | ৩০ জুন ২০২৪
  • নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ১০ বছর আগের সেই দিন ফের ফিরল শহরে। এবার অবশ্য একটি নয়, একের পর এক গণপ্রহারের ঘটনা ঘটেই চলেছে। শহর কলকাতা, তার আশপাশ এবং রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে গণপ্রহারে মৃত্যু হচ্ছে মানুষের। কখনও বউবাজার। কখনও সল্টলেক। কখনও বারাসত, কাঁকুড়গাছি, কসবা, টালিগঞ্জ, আনন্দপুর বা তিলজলায় মারা পড়ছে মানুষ। নদীয়া এবং অন্যান্য জেলাতেও লাগামছাড়াভাবে বাড়ছে নিজের হাতে আইন তুলে গণপ্রহারের পৈশাচিক শাস্তিবিধান। প্রায় ১০ বছর আগে ২০১৪ সালের নভেম্বরে এনআরএস মেডিক্যাল কলেজ হস্টেলে কোরবান শাহ নামে এক ২৮ বছরের যুবককে মোবাইল চোর সন্দেহে খুন করার অভিযোগ উঠেছিল ১২ জনের বিরুদ্ধে। উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল, অভিযুক্তদের মধ্যে ন’জনই ছিলেন এনআরএস’এর ডাক্তারি ছাত্র, নয়ত জুনিয়র ডাক্তার। 


    শুক্রবার বউবাজারের উদয়ন হস্টেলে এক টিভি মেকানিককে মোবাইল চোর সন্দেহে পিটিয়ে মেরে ফেলার অভিযোগ ওঠার ২৪ ঘণ্টাও কাটল না, শনিবার সল্টলেকে মোবাইল চুরির অভিযোগে পিটিয়ে মেরে ফেলা হল এক ব্যক্তিকে। এই দু’টি ঘটনার আগে বারাসত, কাঁকুড়গাছি, কসবা সহ বিভিন্ন জায়গায় শিশু চুরির অভিযোগ বা শিশু চুরি গিয়েছে গুজবকে কেন্দ্র করে একাধিক বেপরোয়া গণপিটুনির ঘটনা ঘটে গিয়েছে। নৃশংস খুনগুলির পর সচেতন নাগরিকরা প্রশ্ন তুলছেন, ‘হঠাৎ করে কি এমন হল যে, হু হু করে বাড়ছে গণপ্রহারের প্রবণতা? 


    বিশিষ্ট মনরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ দেবাঞ্জন পান বলেন, ‘যতদিন যাচ্ছে হিংস্রতা বাড়ছে মানুষের মধ্যে। সেই হিংস্রতা বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ, অবদমিত রাগ ও আক্রোশ। সংসার বা কর্মক্ষেত্রে হুটহাট রেগে যাওয়ায় সমস্যা আছে, তাই অসহায় মানুষ পেলেই তার উপর রাগ দেখিয়ে অবদমিত আক্রোশ মিটিয়ে নিচ্ছেন কিছু মানুষ। জীবনে কাঙ্খিত কিছু না পেয়েও মনে তৈরি হচ্ছে অতৃপ্তি। এও দেখা যাচ্ছে, অভিযুক্তদের বেশিরভাগেরই বয়স পঁচিশ থেকে তিরিশের মধ্যে। তারও বৈজ্ঞানিক কারণ আছে। ওই বয়সে মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স সেভাবে সুগঠিত হয় না। বিচার-বিবেচনা, ভালো-মন্দবোধ পরিপক্ক হয় না।’ বিশিষ্ট মনোবিদ ডঃ অমিত চক্রবর্তী বলেন, ‘হিংস্রতা বাড়ছে। নিজের জীবনের অতৃপ্তি, না পাওয়ার রাগ কিছু মানুষ মেটাচ্ছেন অন্যের উপর। সঙ্গে সঙ্গত দিচ্ছে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম এবং সোশাল মিডিয়ার অবিরাম দেখাতে থাকা হিংস্র দৃশ্য। ১০-২০ বছর আগেও এইসব না পাওয়ার ঝাল মানুষ মেটাতেন সিনেমা হলে, নিজেকে মাচো হিরো ভেবে অথবা ফুটবল মাঠে নেমে। আর এখন অল্পবয়সিরা ভাবছেন, বাস্তব জীবনেও বোধহয় হিংস্রতা দেখানোই হল টিকে থাকার একমাত্র রাস্তা। শুধু তাই নয়, ‘গণ’ হিসেবে প্রহার দেওয়ার সময় অনেকের মনে এই বোধটা কাজ করে, একসঙ্গে মারছি তো, বোধহয় ধরা পড়ব না।’ 
  • Link to this news (বর্তমান)