অপারেশনে নকল বোমা, জ্যামার ও ড্রোন, সুবোধের নিখুঁত কৌশল
বর্তমান | ০১ জুলাই ২০২৪
সুমন তেওয়ারি, আসানসোল: লুট, ডাকাতি থেকে সুপারি কিলিং— হডিউড সিনেমার রোমহর্ষক চিত্রনাট্যকে বাস্তবের মাটিতে নামিয়ে এনছিল বিহারের কুখ্যাত গ্যাংস্টার সুবোধ সিং। তার অপারেশন মানেই নিখুঁত পরিকল্পনা আর অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার। তাই, সুবোধের গ্যাংয়ের প্রশিক্ষিত সদস্যরা অপারেশনে ব্যবহার করে নকল বোমা, জ্যামার ও ড্রোন ক্যামেরা। রানিগঞ্জে যে অপরাধের তদন্তে সিআইডি তাকে হেফাজতে নিয়েছে, তার চিত্রনাট্য চমকে দেওয়ার মতো। ব্যবসায়ীর প্রাসাদোপম বাড়ির দেওয়ালে লাগানো হয়েছিল নকল বোমা। পুরো বাড়িটিকে বর্হিজগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার জন্য আনা হয়েছিল পোর্টেবল জ্যামার। নজরদারি চালানো হচ্ছিল অত্যাধুনিক ড্রোন ক্যামেরায়। সিআইডি সূত্রে জানা গিয়েছে, বাংলা সহ দেশের সাত রাজ্যের পাশাপাশি নেপালেও একাধিক বড় ডাকাতির ঘটনা ঘটিয়েছে এই সুবোধ। ফলে, সে এখন আন্তজার্তিক গ্যাংস্টার। নেপালে শুধু ডাকাতির ঘটনাই নয়, সেখানে একাধিক সোর্স রয়েছে সুবোধের। তাদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগও রয়েছে। তদন্তকারী সংস্থার সূত্রে জানা গিয়েছে, লুটের কেজি কেজি সোনা নেপালে গলিয়ে ফের তা বাংলাতেই বিক্রি করা হয়। সোনা লুটের পাশাপাশি এখন সুবোধ ব্যবসায়ী, শিল্পপতিদের অপহরণ, তোলা চাওয়ার মতো নানা বড় অপারেশন সংগঠিত করার উপর বাড়তি জোর দিয়েছিল সে।
২০২০ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি সেই ভয়ঙ্কর রাতের কথা মনে পড়লে এখনও শিউরে ওঠেন রানিগঞ্জবাসী। ঠিক কী ঘটেছিল সেদিন রাতে? তখন ভর সন্ধ্যা। অত্যাধুনিক বিদেশি পিস্তল হাতে ব্যবসায়ী সুন্দর ভালোটিয়ার বাড়িতে ঢুকে পড়ে ডাকাত দল। ঢুকেই বাড়ির দেওয়ালে নকল বোমা বেঁধে দেয় তারা। তবে, জ্যামারটি অন করার আগেই বাড়ির এক মহিলা পুলিসকে ডাকাতদের খবর দিয়ে দেন। এদিকে, জ্যামার অন করে ডাকাতরা রাজেন্দ্র ভালোটিয়াকে অপহরণ করে তাঁর দুর্গাপুরের সোনার শোরুমে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। ততক্ষণে বাড়ি ঘিরে ফেলে তৎকালীন পুলিস কমিশনারের নেতৃত্বে পুলিসের বিশাল বাহিনী। শুরু হয়ে দু’পক্ষের গুলিযুদ্ধ। মুহূর্তে রণক্ষেত্রের চেহারা নেয় গোটা এলাকা। গুলি চালাতে চালাতে দুষ্কৃতীদলের কয়েকজন পালিয়ে গেলেও ধরা পড়ে যায় সোনু যাদব, রসুল শেখ ও মনিন্দর সিং। ঘটনায় এক পুলিস ও এক ডাকাত গুলিবিদ্ধ হয়।
সিআইডি তদন্তভার নিয়ে জানতে পারে গোটা পরিকল্পনাটাই সুবোধের। ব্যবসায়ীকে বাড়ি থেকে তাঁর গাড়িতে করেই দুর্গাপুর নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। পরিবারের সবাইকে বেঁধে বোমার ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়ার ছক ছিল। বাড়ি ও ব্যবসায়ীকে নিয়ে যাওয়ার গাড়িতে পোর্টেবল জ্যামার অন করা ছিল। যাতে শত চেষ্টা করেও কেউ বাইরে যোগাযোগ করতে না পারেন। পরিকল্পনাটি সফল করতে দেড় মাস ধরে ড্রোন ক্যামেরার মাধ্যমে রেকি করেছিল সুবোধের টিম।
সিআইডি তদন্ত নেমে প্রথমে সুবোধের অতি ঘনিষ্ঠ ওয়াসিমূল হক আনসারিকে গ্রেপ্তার করে নেপাল বর্ডার থেকে। তার থেকেই নেপালে সুবোধের জাল সম্পর্কে জানতে পারে গোয়েন্দারা। সুবোধ গ্যাংয়ের লুটের সব সোনাই যায় নেপালে। সেখানে তার কারিগররা দ্রুত তা গলিয়ে সোনার বারে পরিণত করে। তাই ডাকাত ধরা পড়লেও লুট করা সোনা ফেরত পায়না কোনও রাজ্যের পুলিস।
বছর চল্লিশের এই গ্যাংস্টারের নিখুঁত অপারেশন কৌশল অনেকের নজর কাড়ে। একের পর এক হাইপ্রোফাইল খুনের বরাত আসতে থাকে তার কাছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বাংলায় বিজেপি কাউন্সিলার মনীশ শুল্কা হত্যা।
সুবোধের সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডের সরাসরি যোগ রয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। প্রভাবশালীদের গুলিতে ঝাঁঝরা করার কাজে তাঁর গ্যাংয়ের জুড়ি মেলা ভার। তাই এখনও কিনারা না হওয়া দুর্গাপুরের ব্যবসায়ী রাজু ঝাঁ ও আসানসোলের ব্যবসায়ী অরবিন্দ ভগত শ্যুটআউট কাণ্ডেও তাকে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে কিনারা করার আশা করছে পুলিস। ফলত, সুবোধকে বাংলায় আনতে পারায় আসানসোল ও বারাকপুর শিল্পাঞ্চলে একাধিক বড় অপরাধের কিনারা হবে বলেই গোয়েন্দাদের আশা।