শ্যামলেন্দু গোস্বামী, বারাসত: বয়স ৯৬। হাতে পায়ে জোর নেই বললেই চলে। মাথা গোঁজার জায়গা বলতে রেললাইনের পাশের অস্থায়ী ছাউনি। এই বয়সেও সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অক্লান্ত পরিশ্রম করেন মধ্যমগ্রামের পুষ্প মণ্ডল। কাঁপা কাঁপা হাতে আলু মেখে, তেঁতুল জল দিয়ে ক্রেতাদের হাতে তুলে দেন জিভে জল আনা ফুচকা। বয়স যে কেবল একটা সংখ্যা—জীবন সংগ্রামে তার প্রমাণ রেখে চলেছেন ১০০ ছুঁইছুঁই বৃদ্ধা।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশে তাঁর স্বামীকে গুলি করে হত্যা করে দুষ্কৃতীরা। তখন প্রাণ বাঁচাতে এপার বাংলায় এসে আশ্রয় নেন পুষ্পদেবী। তারপর শুরু হয় টিকে থাকার লড়াই। এপার বাংলায় এখনও তাঁর কোনও স্থায়ী আশ্রয় নেই। রেললাইনের পাশের ঘুপচি ঘরেই জীবন কাটান তিনি। সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে এখন অবশ্য এই ফুচকা বিক্রেতা বৃদ্ধা ভাইরাল। মধ্যমগ্রাম ১ নম্বর প্ল্যাটফর্মের টিকিট কাউন্টার সংলগ্ন মাঠে বিকেলের পর থেকে দেখা মেলে পুষ্পর। নিজের হাতেই তৈরি ফুচকা আলু আর তেঁতুলের জল দিয়ে তুলে দেন ক্রেতাদের হাতে। কথায় কথায় তিনি বললেন, ‘এক মেয়ে রয়েছে আমার। ফুচকা বিক্রি করেই তাঁর বিয়ে দিয়েছি। ওর শ্বশুরবাড়ি শিলিগুড়িতে। তবে মেয়ের সংসারে আমি বোঝা হতে চাই না। তাই নিজেই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি। ১০০ হোক ২০০, যা রোজগার হয়, তা দিয়ে কোনওরকমে চলে যায় একার। কোথায় থাকেন? কী খাওয়া হয়? কিছুক্ষণ অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। তারপর হাসতে হাসতে বললেন, ‘কেউ তো জিজ্ঞাসা করে না। যাক, আপনি করলেন। আমি মধ্যমগ্রাম স্টেশনের পাশে সুভাষপল্লিতে থাকি। দাঁত তো নেই। বেশিরভাগ দিন ছোলার ছাতু বা মুড়ি ভিজিয়ে খাই। দুপুরে গলাভাত খাই। মাঝেমধ্যে মাছ-ডিম খাই।’ এই বয়সে আপনি দোকান নিয়ে এখানে আসেন কীভাবে? বৃদ্ধার জবাব, ‘এই যে ঠেলাগাড়ি দেখছেন, এটা আমি নিজেই ঠেলে আনতে পারি এখনও। কষ্ট হয়। মাঝপথে একটু জিরিয়ে নিয়ে আবার শুরু করি। তবে ফুচকার বিক্রি আগের তুলনায় অনেক কমে গিয়েছে বলে আক্ষেপ করলেন তিনি। এখন দোকানের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া এবং নতুন নতুন খাবার বাজারে এসে যাওয়ায় বিক্রিবাটা কম বলে মনে করেন তিনি। শেষে তিনি বেশ আত্মতৃপ্তির সুরেই বললেন, ‘এই ব্যবসা আমার নিজের। তা যতই ছোট হোক না কেন, আমি এই লড়াই চালিয়ে যেতে চাই আমৃত্যু।’ -নিজস্ব চিত্র