• বহু স্মৃতিমাখা রামপুরহাটের ‘মিটিং পয়েন্ট’ কালুদার দোকানই এখন স্মৃতির অতলে
    বর্তমান | ০৮ জুলাই ২০২৪
  • সংবাদদাতা, রামপুরহাট: পে লোডারের ধাক্কায় নিমেষে চুরমার অর্ধ শতাব্দীর স্মৃতি মাখা ‘কালুদার দোকান’। প্রেমিক-প্রেমিকা, বন্ধুবান্ধব থেকে কেজো মানুষদের ‘মিটিং পয়েন্ট’ ছিল এই কালুদার দোকান। রামপুরহাট ও আশপাশের গ্রামের বহু মানুষের নানা স্মৃতি এই কালুদার দোকানকে ঘিরে। এই দোকানের সামনেই গড়ে উঠেছে কত প্রেম, বন্ধুত্ব, জন্ম নিয়েছে কত স্বপ্ন, হয়েছে কাজের ‘ডিল’, হয়তো ভেঙেছেও। সেই কালুদার দোকানই এবার স্মৃতি হয়ে গেল। প্রশাসনের দেওয়া ডেডলাইন মেনে ‘জবরদখল’ মুক্ত হল এসডিও অফিসের সামনের ফুটপাত। যদিও রীতিমতো রসিদের বিনিময়ে এসডিও অফিসে ভাড়া দিয়ে চলত এই দোকান। গত কয়েকবছর ধরে অবশ্য আর ভাড়া নেওয়া হতো না। 


    রামপুরহাট শহরের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ভূপেন্দ্রনাথ নন্দী শহরের প্রাণকেন্দ্র পাঁচমাথার মোড়ে এসডিও অফিসের পাঁচিলের একটি কোণে খল্পা দিয়ে একটি ভাতের হোটেল খোলেন। তার জন্য এসডিও অফিসকে বছরে ১২৫ টাকা করে ভাড়া দিতে হতো তাঁকে। ভূপেন্দ্রবাবু মারা যাওয়ার পর ৭১ সাল থেকে দোকান সামলে আসছিলেন তাঁর ছেলে সুশান্ত নন্দী। তখন মহকুমায় কলেজ বলতে একমাত্র রামপুরহাটে। বাসস্ট্যান্ডও ছিল স্টেশন চত্বরে। পডুয়া থেকে বাস ও রেল কর্মী, যাত্রী, শিক্ষক সকলের কাছেই খিদে মেটানোর জায়গা ছিল এই দোকানটিই। খুব অল্প টাকায় ঘরোয়া খাবার মিলত। স্বল্পভাষী সুশান্তর মিষ্টি ব্যবহারে অচিরেই তিনি সকলের ‘কালুদা’ হয়ে উঠেছিলেন। ডাকনাম ‘কালোসোনা’ থেকেই ‘কালুদা’। বিডিও থেকে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, অনেকেই ছিলেন তাঁর দোকানের ‘মান্থলি’ খদ্দের।


    ২০০০ সালের ভয়াবহ বন্যায় কালুদার দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখনই ঝুপড়ি সরিয়ে ইটের গাঁটনি ও খড়ের চালা দিয়ে ফের শুরু হয় দোকান। এসডিও অফিসের ভাড়া বেড়ে হয় বছরে ২৭৫০ টাকা। বর্তমানে সব দোকানেই উনুনের জায়গা নিয়েছে গ্যাস, ইনডাকশন। কিন্তু কালুদার দোকানে বারো মাস কয়লার উনুনে রান্না হতো।  তাঁর মতে, কয়লার উনুনের রুটি ও রান্নার স্বাদই আলাদা। খড়ের চালার দোকান হলেও গুণমানের সঙ্গে আপোষ করতেন না। গ্রামগঞ্জ থেকে আসা মানুষের ভিড় লেগেই থাকত তাঁর দোকানে। রাতে শহরবাসীর ভিড় করত রুটি, সব্জি নেওয়ার জন্য। চলত আড্ডাও। কাজের লোক রাখলে খাবারের দাম বাড়াতে হতো, তাই ও পথে হাঁটেননি। একাই হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে দোকান চালিয়ে আসছিলেন। দোকানের আয়েই তাঁর সংসার চলত। সেই দোকান শেষ।


    অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অধীর দাস বলেন, ১৯৮৮ সাল থেকে আমি ছিলাম কালুদার মান্থলি খদ্দের। দু’বেলা খেতাম। রাতে খাওয়া দাওয়ার পাশাপাশি এগারোটা পযর্ন্ত আড্ডা। অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে দোকানটিকে ঘিরে। বিয়ে করার পরও মাঝেমধ্যে কালুদার দোকানে খেতে যেতাম। সেই দোকান ভাঙা পড়ায় খুব খারাপ লাগছে। 


    এদিন দোকানের ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়িয়েছিলেন কালুদা। চোখে মুখে হতাশা। বললেন, তিল তিল করে গড়ে তোলা স্বপ্ন ভেঙে চুরমার। এখন ৬৫ বছর বয়সে কী করব, পেট চলবে কীভাবে সেই চিন্তাই কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। অনেকেই এদিন সাক্ষী ছিলেন কালুদার দোকানের অন্তিম লগ্নের। তাঁদের কেউ কেউ বললেন, প্রশাসন তো বলেছে ফুটপাতে ছাতা নিয়ে ব্যবসা করা যাবে। সেভাবেই নতুন করে শুরু করুন। দেখা যাক নতুন স্মৃতির জন্ম হয় কিনা।  ভাঙা দোকানের সামনে কালুদা। 
  • Link to this news (বর্তমান)