বাকচায় দুষ্কৃতীদের হাতে খুন হয়েছিলেন বাবা প্রতিকূলতাকে হারিয়ে ডাক্তার কৌশিক
বর্তমান | ২৩ জুলাই ২০২৪
শ্রীকান্ত পড়্যা, তমলুক: বাকচা মানেই বোমা-গুলি। বাকচা মানেই রাজনৈতিক হিংসা। গত কয়েক বছর রাজনৈতিক হানাহানির কারণেই ধারাবাহিকভাবে সংবাদ শিরোনামে এসেছে ময়নার এই উপদ্রুত জনপদ। ২০১৯ সালের ১৪ অক্টোবর বাকচায় বসুদেব মণ্ডল খুন হন। তিনি ২০১৩-’১৮ টার্মের তৃণমূল কংগ্রেসের পঞ্চায়েত সদস্য ছিলেন। বিজেপি আশ্রিত দুষ্কৃতীরা নৃশংসভাবে তাঁকে খুন করে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, বাবার মৃত্যু সহ যাবতীয় বাধা কাটিয়ে সেই বসুদেবের ছেলে কৌশিক মণ্ডল আজ চিকিৎসক। বর্তমানে এনআরএস মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্ন। পারিপার্শ্বিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও বাকচার নিহত তৃণমূল নেতার ছেলের গলায় ঝুলছে টেথস্কোপ। ছেলের এই সাফল্যে চোখের জল মুছতে মুছতে মা খুকুমণি মণ্ডল বলেন, ওর বাবা বেঁচে থাকলে আজ ভীষণ খুশি হতো। উনি ইহলোকে নেই। কিন্তু তাঁর আশীর্বাদ ছাড়া ছেলে ডাক্তার হতে পারত না।
বসুদেব বাকচা গ্রাম পঞ্চায়েতের বরুণা গ্রামের তৃণমূল নেতা ছিলেন। নিজে একবার পঞ্চায়েত সদস্যও হয়েছিলেন। ২০১৮সালে তাঁর স্ত্রী খুকুমণি পঞ্চায়েতের প্রার্থী হলেও হেরে যান। তৃণমূল কংগ্রেসে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে বসুদেব বিজেপির টার্গেট ছিলেন। ২০১৯ সালে তাঁকে বাইক থেকে নামিয়ে দিনের বেলায় নৃশংসভাবে কোপানো হয়। তারপর মৃত্যু নিশ্চিত করতে ড্রিল মেশিন দিয়ে শরীর ফুটো করে দেওয়া হয়েছিল। মর্মান্তিক ওই ঘটনায় সকলে আঁতকে উঠেছিল।
বসুদেবের মৃত্যুর ঘটনা গোটা ময়নায় হইচই ফেলে দিয়েছিল। বসুদেবের দুই ছেলে। বড় ছেলে অনুপ মণ্ডলকে রাজ্য সরকার কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেয়। ছোট ছেলে কৌশিক বেশ বাংলাদেশ থেকে এমবিবিএস কোর্স করেন। তারপর ফরেন মেডিক্যাল গ্র্যাজুয়েট পরীক্ষায় রাজ্যস্তরে ১৫ র্যাঙ্ক করে এনআরএস মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ইন্টার্নশিপ করছেন। বাবা রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ায় হিংসার বলি হন। সব বাধা পেরিয়ে কৌশিক আজ একজন চিকিৎসক।
বসুদেবের মামাবাড়ি বরুণা লাগোয়া গোড়ামহাল গ্রামে। তাঁর দাদু মণীন্দ্রনাথ ভৌমিক তৃণমূল কংগ্রেস করতেন। ২০০৫ সালে ১৭জুলাই সিপিএম আশ্রিত দুষ্কৃতীরা মণীন্দ্রনাথবাবুর বাড়িতে হামলা চালায়। তাঁকে লক্ষ্য করে বোমা ছোড়ে। বাঁ হাতে বোমা পড়ে। ওই ঘটনার পর থেকেই বাঁ হাতটাই নেই। ১৪ বছরের ব্যবধান। ২০১৯ সালে মণীন্দ্রনাথবাবুর জামাই বসুদেব রাজনৈতিক রোষে খুন হন। ২০০৫ সালে যারা সিপিএম আশ্রিত ছিল, ২০১৯ সালে তারাই রাজনৈতিক পরিচয় বদল করে বিজেপি আশ্রিত গুন্ডা। রাজনৈতিক পরিচয় বদল হলেও মুখগুলো একই ছিল। ২০১৯ সালের পর বসুদেবের পরিবার এবং মণীন্দ্রনাথবাবুর পরিবার সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে এসেছে।
কৌশিক বলেন, বাকচায় অনেক মেধাবী ছেলেমেয়ে আছে। কিন্তু, পড়াশোনা করার পরিবেশ নষ্ট হতে বসেছে। রাতে বোমা পড়লে পড়াশোনায় ব্যাঘাত হবেই। এই অস্থিরতায় অনেকের পড়াশোনায় সমস্যা হয়। আমারও হয়েছিল। আমার বাবা রাজনৈতিক হিংসায় খুন হয়েছেন। তাই আমি চাই, বাকচায় এই হানাহানি বন্ধ হোক। ছেলেমেয়েদের জন্য সুন্দর পরিবেশ হলে এলাকার উন্নতি হবে। মানবসম্পদ বৃদ্ধি পাবে। অতীতকে ভুলে সামনের দিকে এগিয়ে চলুক বাকচা।