• ৪৮ বছর পর ডাকটিকিট প্রতারণা মামলার নিষ্পত্তি
    বর্তমান | ০১ আগস্ট ২০২৪
  • সুকান্ত বসু, কলকাতা: ‘তারিখ পে তারিখ, তারিখ পে তারিখ’... এই ডায়লগ কানে এলেই ভেসে ওঠে দামিনী সিনেমা। সানি দেওলের শক্ত চোয়াল, মুষ্টিবদ্ধ হাত। মামলার দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে বিচারককে চোখা চোখা অথচ যুক্তিযুক্ত শব্দে বুঝিয়ে দেওয়া আইন ব্যবস্থার ফাঁক। সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হল আলিপুর আদালতে। এক-দু’বছর নয়, টানা ৪৮ বছর ধরে চলল মামলা। অবশেষে বুধবার যবনিকা পতন। শেষ অভিযুক্ত বছর আশির প্রদীপ পাঠককে বেকসুর খালাস করে মামলায় ইতি টানলেন বিচারক। অসুস্থ শরীরে আদালত কক্ষ থেকে বেরতে বেরতে বৃদ্ধের মুখে তখন যুদ্ধজয়ের হাসি।


    ডাক টিকিট হাতিয়ে নেওয়া ও রেডিও লাইসেন্স রিনিউ করিয়ে দেওয়ার নামে আর্থিক তছরুপ। ১৯৭৭ সালে আলিপুর থানায় এই সংক্রান্ত মামলাটি দায়ের করা হয়েছিল আলিপুর ডাকঘরের তরফে। অভিযোগ ছিল, ডাক টিকিট হাতিয়ে নেওয়া ও রেডিও লাইসেন্স রিনিউ করে দেওয়ার নামে বিভিন্ন ব্যক্তির সই জাল করে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে একটি ‘চক্র’। মোট ১৬ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। মামলা দায়ের হয় প্রতারণা, জালিয়াতি, ষড়যন্ত্র সহ একাধিক ধারায়। মামলাটি আলিপুর থানায় দায়ের হলেও, পরবর্তীতে তদন্তভার গ্রহণ করে কলকাতা গোয়েন্দা পুলিস। তদন্ত শেষ করে আলিপুর আদালতে ৩৬ জনকে সাক্ষী করে চার্জশিট দেওয়া হয়। কিন্তু তারপর শুরু হয় টালবাহানা। আলিপুর পুলিস কোর্ট থেকে মামলাটি জজ কোর্টে যেতেই লেগে যায় দীর্ঘ সময়। পরবর্তী সময়ে মামলাটি জেলা কোর্টে গেলেও ‘তারিখ পড়া’ আর কিছুই হয়নি সেখানে। ফল? দীর্ঘ ৪৮ বছরের আইনি লড়াই।


    কিন্তু এত সময় কেন লাগল? আদালত সূত্রে খবর, মামলায় অভিযুক্ত ১৬ জনের মধ্যে আটজনই ছিলেন ‘ফেরার’। বিচার চলাকালীন মারা যান সাতজন। জামিন নিয়ে সলতের মতো টিকেছিলেন একমাত্র প্রদীপ। এদিন শুনানির অনেক আগেই কোর্টে হাজির হন তিনি। সঙ্গে এসেছিলেন তাঁর পরিজন। গাড়ি থেকে নামানোর পর অনেক কসরত করে তাঁকে এজলাসে হাজির করা হয়। এরপরই আলিপুরের সপ্তম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা বিচারক অঞ্জনকুমার সেনগুপ্ত তাঁকে খালাসের কথা জানিয়ে দেন। দক্ষিণ ২৪ পরগনার মুখ্য সরকারি আইনজীবী শিবনাথ অধিকারীর দাবি, ‘এত পুরনো মামলা এই কোর্টে নেই বললেই চলে। সেদিক থেকে এটি উল্লেখযোগ্য তো বটেই।’           মামলার বিশেষ সরকারি কৌঁসুলি উষারঞ্জন চক্রবর্তী কোর্ট চত্বরে বলেন, ‘নানা আইনি গেরোয় এই মামলা শেষ হতে এত সময় গড়িয়ে গেল। সব থেকে আশ্চর্যের বিষয় ৩৬ জন সাক্ষীর মধ্যে একজনকেও পাওয়া যায়নি। কোর্টের তরফে বার বার সমন করেও কাজ হয়নি। মামলায় যদি সাক্ষীই না পাওয়া যায়, তাহলে কিসের ভিত্তিতে চলবে বিচার!’ প্রদীপবাবুর আইনজীবী শ্যামসুন্দর চোপড়া বলেন, ‘দুঃখ একটাই। আমার মক্কেলকে এতদিন বৃথা আইনি লড়াই লড়তে হল।’ তিনিই যেন এদিন আলিপুর আদালতে দামিনীর ‘অ্যাডভোকেট গোবিন্দ শ্রীবাস্তব’।মামলার খতিয়ান


     মোট ১৬ অভিযুক্তের মধ্যে ৮ জন ‘ফেরার’। শুনানি চলাকালীন মৃত ৭


     ৩৬ জন সাক্ষীকে খুঁজেই পাওয়া যায়নি


     মামলার নথির ওজন প্রায় আট‑নয় কেজি


     ৪৮ বছরের পুরনো এই মামলায় প্রায় ১৫ জন বিচারক বদল


     ১৬ জনের মতো সরকারি কৌঁসুলি পরিবর্তন                                    
  • Link to this news (বর্তমান)