সংবাদদাতা, বোলপুর: বিশ্বভারতীর কলাভবনের গুণী শিল্পীদের মধ্যে অন্যতম কে জি সুব্রহ্মণ্যন। পুরো নাম কলপতি গণপতি সুব্রহ্মণ্যন। শান্তিনিকেতনে তিনি সমধিক পরিচিত ছিলেন ‘মানিদা’ বলে। শিল্পসত্ত্বার গুণে নিজের জীবদ্দশাতেই হয়ে উঠেছিলেন কিংবদন্তি। দেশ-বিদেশ থেকে পেয়েছেন বড় বড় সম্মান। একাধিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শান্তিনিকেতন, কলাভবন ও শিল্পের জন্য তিনি ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। বৃহস্পতিবার এই মনীষীর শিল্পকলা প্রদর্শনীর মাধ্যমে জন্মশতবর্ষ উদযাপন শুরু করল কলাভবন। এরপর টানা এক বছর নানা উৎসব, অনুষ্ঠান, প্রদর্শনীর মাধ্যমে শিল্পীকে সম্মান জানানো হবে বলে কলাভবন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। শিল্পপ্রেমীদের প্রাপ্তি মানিদার শেষ ১০ বছরে বিভিন্ন মাধ্যমে আঁকা ১০৪টি ছবির প্রদর্শনী। শান্তিনিকেতনের নন্দন আর্ট গ্যালারিতে প্রদর্শনীটি আয়োজন করা হয়েছে। সূচনা লগ্নে কার্যত চাঁদের হাট বসেছিল নন্দনে। শিল্পীকে সম্মান জানাতে পেরে গর্বিত বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ। কলাভবনের এই প্রয়াসকে সাধুবাদ জানিয়েছেন শিল্পীর কন্যা উমা পদ্মনাভন। এক মাস ধরে এই প্রদর্শনী চলবে বলে কলাভবন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
সালটা ১৯৪৪। শিল্প নিয়ে পড়াশোনা করতে শান্তিনিকেতনে এলেন সুব্রহ্মণ্যন। কলাভবনের তখন স্বর্ণযুগ। আচার্য নন্দলাল বসু, বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়, রামকিঙ্কর বেজের মতো রথী-মহারথীদের নাম চতুর্দিকে। স্বভাবতই গুণিজন সাহচার্যে তরুণ সুব্রহ্মণ্যনের শিল্প-ভাবনা সমৃদ্ধ হতে থাকে। ১৯৪৮ সাল। কলাভবনে শিল্পকলার পাঠ চুকিয়ে তিনি বরোদার মহারাজা সায়াজি রাও বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনায় যোগ দেন। পরে লন্ডন, নিউইয়র্কেও শিল্প নিয়ে পড়াশোনা করেন। কিন্তু শান্তিনিকেতনের প্রতি মায়া ছাড়তে পারেননি তিনি। অকৃপণ প্রেম-বন্ধনে জড়িয়ে পড়েছিলেন কবিগুরুর স্বপ্নের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। ফলে, ফের ফিরে আসেন শান্তিনিকেতনে। সময়টা আশির দশক। যোগদান করেন কলাভবনের পেইন্টিং বিভাগে। খাতায়-কলমে অবসর গ্রহণ করেন ১৯৮৯ সালে।
কলাভবন প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে সুব্রহ্মণ্যন শিল্পকর্মের বহু নমুনা। মাস্টারমশাই নন্দলাল বসুর স্টুডিওর নতুন রূপদান থেকে শুরু করে শান্তিনিকেতনের প্রকৃতিকে সাদাকালো রঙের মাধ্যমে স্থাপন করেছিলেন ডিজাইন বিভাগের দেওয়ালে। ১৯৯০, ২০০২ ও ২০০৯ সাল। মোট তিনবার তাঁর সেই কাজ আন্তর্জাতিক স্তরে চর্চিত হয়েছে। ১৯৬৫ সালে ললিতকলা অ্যাকাডেমি থেকে পান জাতীয় পুরস্কার। ১৯৭৫ সালে পদ্মশ্রী ও ১৯৯২ সালে রবীন্দ্রভারতী থেকে ডি লিট উপাধিতে সম্মানিত হন সুব্রহ্মণ্যন। ১৯৯১ সালে বিশ্বভারতীর সমাবর্তন অনুষ্ঠানে পান গগন-অবন পুরস্কার। ২০০৬ ও ২০১২ সালে পান ভারত সরকারের পদ্মভূষণ ও পদ্মবিভূষণ পুরস্কার। এর মাঝে ২০০৯ সালে বিশ্বভারতী তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ সম্মান দেশিকোত্তমে ভূষিত করে।
এদিন প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শিল্প বিশেষজ্ঞ ডঃ অশোককুমার দাস, শিল্পীর মেয়ে উমা পদ্মনাভন, কলাভবনের প্রাক্তন বিশিষ্ট অধ্যাপক আর শিবকুমার। তিনি এই প্রদর্শনীর চিত্র নির্বাচক ও কিউরেটর। এছাড়াও ছিলেন কলাভবনের অধ্যক্ষ সঞ্জয় কুমার মল্লিক, নন্দন মিউজিয়ামের ভারপ্রাপ্ত কিউরেটর অধ্যাপক শিশির সাহানা সহ ভবনের অধ্যাপক অধ্যাপিকারা। প্রদর্শনীর তত্ত্বাবধায়ক আর শিবকুমার বলেন মানিদা নিজের জীবনের শেষদিন পর্যন্ত শিল্পচিন্তা ছাড়া আর কিছুই ভাবেননি। তাঁর শিল্পকর্ম আগামী প্রজন্মের কাছে মূল্যবান সম্পদ। আমরা তাঁকে অত্যন্ত কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। এটা আমাদের কাছে গর্বের। - নিজস্ব চিত্র