নিজস্ব প্রতিনিধি, কাঁথি: লোকসভা নির্বাচনে নিজের বিধানসভা থেকে ৯১৬৮ভোটে পিছিয়ে থাকায় এমনিতেই অখিল গিরির মন্ত্রিত্ব পেণ্ডুলামের মতো দুলছিল। মন্ত্রীপদ চলে যাওয়ার দিকেই পাল্লা ছিল ভারী। শনিবার তাজপুরে বনদপ্তরের মহিলা রেঞ্জ অফিসারের সঙ্গে অখিল গিরির অভব্য আচরণ সেই সম্ভাবনাকে ত্বরান্বিত করে। একজন মহিলা অফিসারকে কুরুচিকর ভাষায় শুধু আক্রমণই নয়, তাঁর মেয়াদ আট-দশদিন বলে হুমকি দিয়েছিলেন। কিন্তু, ঘটল উল্টোটা। ওই রেঞ্জ অফিসার সাহসিকতার সঙ্গে ডিউটি করায় স্বয়ং বনমন্ত্রী বীরবাহা হাঁসদার থেকে প্রশংসা পেলেন। আর ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মন্ত্রী পদ খোয়া গেল অখিল গিরির। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশে রবিবার ছুটির দিনে কারাদপ্তরের মন্ত্রিত্ব খোয়ালেন অখিল গিরি। এই ঘটনা নিয়েই তোলপাড় গোটা পূর্ব মেদিনীপুর জেলা সহ রাজ্য রাজনীতি।
এবার লোকসভা নির্বাচনে অখিল গিরি কাঁথি কেন্দ্রের প্রার্থী উত্তম বারিকের সমর্থনে সেভাবে প্রচারে নামেননি। বরং তাঁর অনুগামীরা অন্তর্ঘাত করেছেন বলে অভিযোগ। যে কারণে একজন মন্ত্রীর বিধানসভা এলাকা থেকে দল পিছিয়ে ৯১৬৮ভোটে। অখিল গিরি ও তাঁর অনুগামীদের ভূমিকা নিয়ে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছেও নালিশ ঠুকেছিলেন উত্তম বারিক। ভোটের পরও কাঁথিতে উত্তম বারিক ও জেলা সভাপতি পীযূষ পণ্ডাদের সঙ্গে সমানে রেষারেষি করেছেন অখিল গিরি। ধর্মতলার শহিদ সভার প্রস্তুতি উপলক্ষ্যে ২৪ঘণ্টার ব্যবধানে রামনগরে দলের দুই গোষ্ঠীর ডাকে একই মাঠে প্রকাশ্য সভা হয়। যেখানে দু’পক্ষ পরস্পরের বিরুদ্ধে তোগ দাগে।
পার্টির মধ্যেও অখিল গিরির ঔদ্ধত্যে রামনগর বিধানসভার তৃণমূল কর্মীরা বিদ্রোহের পথে নেমেছিলেন। মঞ্চ থেকেই ঘোষণা করে বুথ সভাপতি, অঞ্চল সভাপতির রদবদল করে দিতেন অখিলবাবু। এর বিরুদ্ধে তৃণমূল কর্মীদের একাংশও খেপে উঠেছিলেন। ২০২৩ সালে পদিমা-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান হন সুশান্ত পাত্র। সেজন্য অঞ্চল সভাপতি পদ ছেড়ে দেন। তাঁর জায়গায় অঞ্চল কোর কমিটি সন্তোষ জানাকে সভাপতি করা হয়। কিন্তু, অখিল গিরি এক মাসের মধ্যে মঞ্চ থেকে ঘোষণা করে সন্তোষ জানাকে সরিয়ে উত্তম দাসকে সভাপতি করেন। অখিল গিরি ঘনিষ্ঠ উত্তমবাবু এখন রামনগর-১ ব্লক তৃণমূল কংগ্রেস কমিটির সভাপতি। তাই বিধায়ক নিজের কাছের লোক বিশ্বজিৎ জানাকে ওই অঞ্চলের কার্যকরী সভাপতি করে অঞ্চল পরিচালনা করছেন। একইভাবে দহদয়া উত্তর বুথের সভাপতি ছিলেন বিজন সোম। তাঁকে অখিল গিরির পছন্দ নয়। তাই মঞ্চ থেকেই অখিলবাবুর বিজন সোমের জায়গায় নির্মাল্য দে-কে বুথ সভাপতি ঘোষণা করেন। এভাবে মঞ্চ থেকেই বুথ সভাপতি, অঞ্চল সভাপতি ঘোষণা করে দিতেন অখিল গিরি।
রবিবার অখিল গিরির মন্ত্রীপদ খোয়া গিয়েছে। তারপরই রামনগরে অখিল বিরোধী শিবির চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। এদিন দহদয়া উত্তর বুথের তৃণমূল নেতা বিজনবাবু বলেন, অপসারিত মন্ত্রী ক্ষমতার দম্ভে মঞ্চ থেকে যাঁদের পদ দিয়েছিলেন, আমরা তাঁদের মানব না। আমি বুথ সভাপতি হিসেবে কাজ করব।
তৃণমূল কংগ্রেসের কাঁথি সাংগঠনিক জেলা সভাপতি পীযূষ পণ্ডা বলেন, দলের শীর্ষ নেতৃত্ব এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা যেটা করেছে তা একদম ঠিক। সিপিএমের জেলা সম্পাদক নিরঞ্জন সিহি বলেন, অখিল গিরি যেসব ভাষা বলেছেন, সেটা সাধারণ মানুষেরও বলা উচিত নয়। মন্ত্রীপদে থেকে এই ভাষা ব্যবহার এককথায় লজ্জাজনক। এটা ভাইরাল হয়েছে। তাই তাঁকে পদত্যাগ করানোর জন্য মুখ্যমন্ত্রী বাধ্য হয়েছেন। বিজেপি নেতা তথা ভগবানপুরের বিধায়ক রবীন্দ্রনাথ মাইতি বলেন, অখিল গিরির মুখের ভাষা থেকে চরম ঔদ্ধত্য প্রকাশ পেয়েছে। এর আগে রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে কুরুচিকর ভাষা ব্যবহার করেছেন। আসলে অখিল গিরির মুখ থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের আসল সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।