নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা ও তমলুক: ‘বিত্তবান নয়, বিবেকাবান নেতা চাই তৃণমূলে’—২১ জুলাইয়ের মঞ্চ থেকে এই বার্তা রাজ্যের কোণায় কোণায় ছড়িয়ে দিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, এর বাইরে গেলে ছেঁটে ফেলতে দু’বার ভাববেন না তিনি। দু’সপ্তাহের মধ্যেই তার প্রমাণ মিলে গেল। মহিলা রেঞ্জ অফিসারের সঙ্গে অভব্যতার ‘পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া’ হিসেবে ইস্তফা দিতে হল মন্ত্রী অখিল গিরিকে। ১৩ বছরের মা-মাটি-মানুষের সরকারে এই প্রথম মন্ত্রীর আচরণে ক্ষুব্ধ মমতা চরম পদক্ষেপ নিলেন।
তাজপুরে কর্তব্যরত অবস্থায় থাকা বনদপ্তরের মহিলা রেঞ্জ অফিসার মনীষা সাউয়ের সঙ্গে রাজ্যের কারামন্ত্রী অখিল গিরির অভব্য আচরণ ও দুর্ব্যবহারের ঘটনা শনিবারই তোলপাড় ফেলেছে গোটা রাজ্যে। মহিলা অফিসারকে ‘গালিগালাজ’ ও ডাং (লাঠি) পেটা করার হুমকির ওই ভিডিও দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ তথা গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী অখিল গিরির আচরণকে কোনওভাবেই সমর্থন করেননি তিনি। তাই অখিলের ভিডিও সামনে আসার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই নিয়েছেন নজিরবিহীন পদক্ষেপ। মমতার নির্দেশ মতো রবিবার সকালে অখিল গিরিকে ফোন করেন তৃণমূলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সি। তিনি অখিলবাবুকে সাফ জানিয়ে দেন, অবিলম্বে ওই মহিলা রেঞ্জ অফিসারের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে এবং ইস্তফা দিতে হবে মন্ত্রিপদে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, পরিস্থিতি এতই উত্তপ্ত যে, অখিল গিরির বক্তব্য শোনারও প্রয়োজন মনে করছে না তৃণমূল। রাজ্যের একজন মন্ত্রী আঙুল উঁচিয়ে এক মহিলা সরকারি অফিসারকে হুমকি দিচ্ছেন—এই চিত্র মেনে নিতে পারবেন না তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব। এর আগে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু সম্পর্কেও আপত্তিকর মন্তব্য করে বিতর্কে জড়িয়েছিলেন অখিল। তার জন্য স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীকে ক্ষমা চাইতে হয়েছিল। কিন্তু এবার আর রেয়াত করলেন না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিশেষ করে যখন দুর্নীতির প্রসঙ্গ টেনে দলকেই অস্বস্তির মুখে ফেলে দিয়েছেন অখিল!
নির্দেশ আসার পর অখিল গিরি বলেন, ‘আমি পদত্যাগপত্র লিখে ফেলেছি। রাতে মুখ্যমন্ত্রীর ই-মেলে সেটা পাঠিয়ে দেব। সোমবার বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রীর হাতে কপি তুলে দেব।’ তবে ইস্তফা দিলেও মহিলা অধিকারিকের কাছে ক্ষমা চাওয়ার কোনও প্রশ্নই নেই বলে পাল্টা সুর চড়িয়েছেন অখিলবাবু। বলেছেন, ‘আমার রাজনৈতিক জীবনে কোনও আধিকারিকের কাছে ক্ষমা চাইনি। এবারও কোনও প্রশ্ন নেই। তাজপুরে উত্তেজনাবশত বনদপ্তরের রেঞ্জ অফিসারকে আমি কিছু কথা বলেছি। তার জন্য আমি অনুতপ্ত। মানুষের জন্য লড়াই করতে গিয়ে হয়তো কোথাও ভুল করেছি। কিন্তু, তাঁদের জন্য লড়াই জারি থাকবে।’
২০২১ সালে মন্ত্রী হয়েছেন অখিল গিরি। মাত্র তিন বছরেই তাঁর মন্ত্রিত্ব চলে গেল। তবে নির্দেশ দেওয়ার পরও মহিলা আধিকারিকের কাছে অখিল গিরি যদি ক্ষমা না চান, তাহলে আগামী দিনে দলগতভাবে আরও কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না, সেই চর্চা চলছে। এরই মধ্যে বনমন্ত্রী বীরবাহা হাঁসদা বলেছেন, ‘দলের নির্দেশ সকলকে মেনে চলা বাধ্যতামূলক। আর সোমবার বিধানসভায় গিয়ে আমিও মুখ্যমন্ত্রীর কাছে গোটা ঘটনার রিপোর্ট দেব।’ রাজনৈতিক মহলে এখন চর্চা চলছে, অখিল গিরির জায়গায় কে আসবেন? পূর্ব মেদিনীপুর থেকেই বা রাজ্য মন্ত্রিসভার প্রতিনিধিত্ব কে করবেন? সূত্রের খবর, এই জেলা থেকে নতুন মন্ত্রী হিসেবে উঠে আসছে বিধায়ক উত্তম বারিকের নাম। তিনি এবার কাঁথি লোকসভা নির্বাচনেও ভালো লড়াই দিয়েছেন।