কলেজের গন্ডি ছুঁলেন লুপ্তপ্রায় জনজাতি বীরহোড় সম্প্রদায়ের প্রথম মহিলা পড়ুয়া
বর্তমান | ০৫ আগস্ট ২০২৪
নিজস্ব প্রতিনিধি, পুরুলিয়া: দুই দিদির হাত ধরেই পুরুলিয়ার লুপ্তপ্রায় বীরহোড় জনজাতির মধ্যে নারীশিক্ষার শুরু হয়েছিল। তবে, কলেজের গন্ডি ছোঁয়ার সৌভাগ্য হয়নি কারওরই। একজন উচ্চমাধ্যমিক পাস করেও কাজের সন্ধানে ভিনরাজ্যে পারি দিয়েছেন, অন্যজন ভিনরাজ্যে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে, দিদিদের অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণ করতে চলেছেন গঙ্গা শিকারি। পুরুলিয়ার বাঘমুন্ডির ভূপতিপল্লির বাসিন্দা গঙ্গা। তিনিই বীরহোড় জনজাতির প্রথম মহিলা, যিনি কলেজের ক্লাসে বসতে চলেছেন। আগামী ৭ তারিখ থেকেই শুরু হবে ক্লাস। তবে, চরম আর্থিক অনটনের মধ্যে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া নিয়ে দ্বিধায় রয়েছেন গঙ্গা।
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ১৯৬০ সালের আগে পর্যন্ত বীরহোড় জানাজাতির মানুষরা জঙ্গলেই বাস করত। যাযাবরের মতো ঘুরে বেড়াত। পরবর্তীতে প্রশাসনই তাদের খুঁজে বের করে বাগমুন্ডির ভূপতিপল্লি এলাকায় থাকার বন্দোবস্ত করে দেয়। তবে, মাথার উপর ছাদ পেলেও শিক্ষার আলো থেকে বহু দূরেই ছিল এরা। ধীরে ধীরে সেই আলোও জ্বলতে শুরু করেছে। স্থানীয় ও প্রসাশন সূত্রে জানা গিয়েছে, কয়েক বছর আগে ভূপতিপল্লিতে কাঞ্চন শিকারি ও সীতারাম শিকারির হাত ধরে গ্রামে প্রথম শিক্ষার আলো পৌঁছয়। সীতারাম বলরামপুর কলেজে ভর্তি হলেও আর্থিক কারণে পড়াশোনা ছাড়তে বাধ্য হন। তারপর ভূপতিপল্লিতে নারীশিক্ষা শুরু হয় দুই বোন রথনি শিকারি ও জানকী শিকারির হাত ধরে। গঙ্গা রথনিও জানকীরই ছোট বোন।
বাড়িতে প্রচণ্ড অভাব। বাবা ভোলানাথ শিকারি মারা গিয়েছেন বছর খানেক আগে। মা তুরিদেবী একাধিক রোগে ভুগছেন। তা সত্ত্বেও পড়াশোনা থেমে থাকেনি গঙ্গার। চলতি বছরেই একলব্য মডেল আবাসিক স্কুল থেকে ৩২৪ পেয়ে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন গঙ্গা। তবে, দিদিদের মতো তাঁরও কলেজের গন্ডি ছোঁয়া হতো না, যদি না বিজ্ঞান মঞ্চের পুরুলিয়া জেলা সম্পাদক নয়ন মুখোপাধ্যায়, বলরামপুর ফুলচাঁদ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক জলধর কর্মকারের মতো মানুষেরা এগিয়ে না আসতেন। জলধরবাবু দীর্ঘদিন ধরেই বীরহোড় জানাজাতিদের নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি আদিবাসী ও লোকশিল্পী সঙ্ঘের জেলা সম্পাদকও। জলধারবাবু বলেন, গঙ্গার দুই দিদি জানকি ও রথনি দুজনেই এক সঙ্গে মাধ্যমিক পাস করেছিলেন। তবে ২০২০ সালের উচ্চ মাধ্যমিকে রথনী ফেল করলেও জনকী পাস করে। কিন্তু কলেজে আর যাওয়া হয়নি তাঁর। বর্তমানে বেঙ্গালুরুতে কাজ করেন তিনি। গঙ্গাই প্রথম বীরহোড় মহিলা, যিনি কলেজের ভর্তি হলেন।
গত শুক্রবারই পুরুলিয়ার নিস্তারিনী মহিলা কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান অনার্সে নিয়ে ভর্তি হয়েছেন গঙ্গা। গোটা ভর্তি প্রক্রিয়ায় তার সঙ্গে ছিলেন এসএফআইয়ের পুরুলিয়ার জেলা সম্পাদক সুব্রত মাহাত। সুব্রত বলেন, পড়াশোনায় বীরহোড়রা এগিয়ে আসার চেষ্টা করে গেলেও তাদের শিক্ষার পর্যাপ্ত পরিকাঠামোর ব্যবস্থা করতে পারেনি প্রসাশন। বাগমুন্ডি থেকে পুরুলিয়া বাস ভাড়া ৪০টাকা। যাতায়াত মিলিয়ে ৮০ টাকা খরচ করে দৈনিক কলেজে আসা কারও পক্ষে কি সম্ভব? গঙ্গাও বলছিলেন, দু›চোখে অনেক স্বপ্ন নিয়ে পড়তে এসেছি। অনেক দূর যেতে চাই। টাকার অভাবে মাঝপথে যাতে পড়াশোনা থেমে না যায়, তার অন্তত ব্যবস্থা করুক প্রসাশন। নিজস্ব চিত্র