• সদ্যোজাত মেয়ের মুখ দেখতেই বাড়ি ফিরছিলেন, যাত্রা থামল মৃত্যুর দুয়ারেবিকানির এক্সপ্রেসের দুর্ঘটনা কাড়ল চান্দামারির যুবকের প্রাণও
    বর্তমান | ১৫ জানুয়ারি ২০২২
  • সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়, কোচবিহার: কথা ছিল, কোচবিহারের বাড়িতে ফিরে প্রথমবার তিন মাসের কন্যা সন্তানের মুখ দেখবেন সুভাষ রায়। ঘাতক বিকানির এক্সপ্রেস সেই সুযোগ তাঁকে দিল না। অভিশপ্ত ট্রেনের এস ১০ কোচের ৮ নম্বর সংরক্ষিত আসনে ছিলেন তিনি। দু’দিন আগে জয়পুর থেকেই চেপেছিলেন। বৃহস্পতিবার বাড়ির কাছে এসে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় সুভাষের (৩২)। দেখতে পেলেন না আদরের মেয়ের মুখ। আর এই খবর কোচবিহার-১ ব্লকের দেওয়ানবশ গ্রামের বাড়িতে আসা মাত্রই শোকে ভেঙে পড়েছে গোটা পরিবার ও এলাকাবাসীরা। দীর্ঘ দিন ধরে জয়পুরে কেবল লাইনের কাজ করতেন সুভাষ। প্রায় সাত-আট মাস আগে গ্রামে এসেছিলেন। ফের জয়পুরে চলে যান। সেখানে বসেই খবর পেয়েছিলেন দুই পুত্র সন্তানের পর একটি কন্যা সন্তান এসেছে তাঁর ঘরে। ট্রেনে আসার সময় শেষবার ডালখোলা থেকে বৃদ্ধ বাবা নির্মল রায়ের সঙ্গে কথাও হয়েছিল। কিন্তু বাড়ির প্রায় দোরগোরায় এসেও আর বাড়ি ফেরা হল না সুভাষের। এদিন গ্রামে গিয়ে দেখা গেল, বৃদ্ধ বাবা উদাস হয়ে আকাশের দিয়ে চেয়ে আছেন। চোখ গড়িয়ে ঝরছে জল। আকস্মিক এই শোক কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না। 

    বিকানির এক্সপ্রেস কেড়ে নিয়েছে পাশেরই আর এক গ্রামের বাসিন্দাকেও। ওই ব্লকেরই চান্দামারি গ্রামের বাসিন্দা চিরঞ্জিত বর্মন (২৪) জয়পুর গিয়েছিলেন টাকার জোগাড় করতে। পেটে পাথর হয়েছে। অস্ত্রোপচারের জন্য টাকার দরকার। তাই মজুরের কাজ করতে গিয়েছিলেন জয়পুরে। টাকা জমিয়ে ফিরছিলেন বাড়ি। কিন্তু সবই বৃথা গেল। বাড়ি ফেরার পথে বৃহস্পতিবারের ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় তাঁরও মৃত্যু হয়েছে। হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান চিরঞ্জিতের বাড়িতে তাঁর অসুস্থ বাবা ও মা রয়েছেন। সেই গ্রামেও শোকের রোল। আর বাড়ির সকলেই যেন পাথর হয়ে গিয়েছে। কথা বলার মত শক্তি নেই কারও। 

    সুভাষবাবুর বাড়িতে থাকেন তাঁর বাবা, মা, তিন ভাই। স্ত্রী টুম্পা রাজভর। তিন সন্তান। বড় ছেলে শুভ রায় আট ও ছোট ছেলে সুরজ রায় পাঁচ বছরের। মেয়ে সুপ্রিয়ার বয়স তিন মাস। এই মেয়েকে দেখতেই তিনি দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে আসছিলেন। দুর্ঘটনার খবর আসার পরেই স্থানীয় তৃণমূল পঞ্চায়েত সদস্য সুভাষবাবুর দাদা বাবুরাম রায় জলপাইগুড়ির উদ্দেশে রওনা দেন। সুভাষবাবুর আরেক ভাই অমল রায়ও জয়পুরে কাজে নিযুক্ত রয়েছেন বলে পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে। 

    এদিকে, চান্দামারি গ্রামে গিয়ে দেখা যায় মৃত চিরঞ্জিত বর্মনের বাড়ির সামনে একটি মাচার উপরে বসে রয়েছেন তাঁর শোকস্তব্ধ বাবা নির্মল বর্মন। চিরঞ্জিতের মা ফুলেশ্বরী বর্মন পেশায় বিড়ি শ্রমিক। ছেলের দুর্ঘটনার খবর আসার পরেই তিনি গিয়েছেন জলপাইগুড়ি। স্থানীয়রা জানান, চিরঞ্জিতের বাবা উপার্জনে অক্ষম। বাস্তুভিটা ছাড়া তাঁদের কোনও জমিজমাও নেই। ট্রেনের এস-৭ কামরায় বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। 

    যাত্রা থামল মৃত্যুর দুয়ারে!
  • Link to this news (বর্তমান)