• বিধির জলাঞ্জলি সাগর-স্নানে
    এই সময় | ১৫ জানুয়ারি ২০২২
  • এই সময়: হাইকোর্টের হাজারো বিধিনিষেধ, প্রশাসনের চোখরাঙানি উপেক্ষা করেই মকর সংক্রান্তির ভোরে সাগরসঙ্গমে ঝাঁপিয়ে পড়লেন হাজার হাজার মানুষ। কোভিড বিধি শিকেয় তুলে দিনভর চলল পুণ্যস্নান।

    মেলায় প্রবেশের আগে করোনা বিধির যে কড়াকড়ি লক্ষ করা যাচ্ছিল, তা স্নানের সময় দেখা যায়নি। কপিলমুনির মন্দির চত্বরেও পুণ্যার্থীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মত। করোনা পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে এ দিন দুপুরেও সমুদ্রতট ও মেলা প্রাঙ্গণে ঘুরে নজরদারি চালান হাইকোর্টের নির্দেশে তৈরি হওয়া কমিটির সদস্য অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সমাপ্তি চট্টোপাধ্যায় ও লিগ্যাল এইড সার্ভিসের সচিব রাজু মুখোপাধ্যায়। দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলাশাসক পি উলগানাথন উপকূল রক্ষী বাহিনীর আধিকারিক অভিজিৎ দাশগুপ্তকে সঙ্গে নিয়ে সাগরতটে পুণ্যার্থীদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখেন। রাজ্যের মন্ত্রী শশী পাঁজা ও পুলক রায়ও মেলা প্রাঙ্গণ-সহ সাগর ঘুরে দেখেন। বিকেলের দিকে মেলা প্রাঙ্গণে যান অরূপ বিশ্বাস। তাঁর সঙ্গে ছিলেন কপিল মুনির মন্দিরের মহন্ত জ্ঞানদাস। মন্ত্রীরা প্রত্যেকেই জানিয়েছেন, 'হাইকোর্টের নির্দেশ মেনেই সুষ্ঠু ভাবে মেলা চলছে।'

    গঙ্গাসাগরে উপচে পড়া ভিড় দেখে বিরক্তি গোপন করেনি হাইকোর্ট কমিটি। শুক্রবারই কমিটির দুই সদস্য সাগরদ্বীপ ছাড়েন। তার আগেই তাঁরা দেখতে পান ৪ ও ৫ নম্বর স্নানের ঘাটে পুণ্যার্থীদের ভিড়। প্রশাসনের কর্তারা তাঁদের বোঝানোর চেষ্টা করেন অন্যান্য বারের তুলনায় অনেকটাই কম ভিড় হয়েছে এ বার। তুলনায় ১,২ ও ৩ নম্বর স্নানের ঘাটগুলিতে অবশ্য ভিড় ছিল না। যদিও প্রশাসনের এই যুক্তিকে হাইকোর্ট কমিটি গুরুত্ব দেয়নি।

    প্রশাসনিক ভাবে জানানো হয়েছে, গত বছরের তুলনায় এবার মাত্র ২৫ থেকে ৩০ শতাংশের বেশি পুণ্যার্থী মেলায় আসেনি। স্নানের ঘাটে হুড়োহুড়ি এড়াতে মাহেন্দ্রক্ষণে প্রশাসন থেকে ড্রোনের সাহায্যে সঙ্গমের জল ছিটিয়ে স্নানের ব্যবস্থা করা হয়। কলকাতার বাবুঘাটেও একই কায়দায় গঙ্গাসাগর মেলায় যেতে না পারা পুণ্যার্থীদের মকর সংক্রান্তির জলের ছিটে ড্রোনের সাহায্যে দেওয়া হয়। পুণ্যার্থীদের জন্য ই-স্নানেরও ব্যবস্থা করেছিল প্রশাসন। সাগর সঙ্গমের জল ঘটে ভরে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ হিসেব বলছে ২ লক্ষ ৭৮ হাজার ৭৮০ জনের বাড়ি পাঠানো হয়েছে এই জল। ই-পুজোর জন্য আবেদন জমা পড়েছিল ১ লক্ষ ৬ হাজার ৬২টি। প্রশাসনিক কর্তারা জানান, এ বার মেলা প্রাঙ্গণে প্রবেশের আগেই ৯৭ হাজার ৩৪৫ জনের র‍্যাপিড অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করানো হয়। আরটি-পিসিআর করানো হয়েছে ১০ হাজার ২১৫ জনের। এর মধ্যে বাবুঘাট ও সাগর মিলিয়ে ১৭১ জন পজিটিভ পাওয়া গিয়েছে।

    তবে অন্যান্যবারের তুলনায় ভিড় কম হলেও সাগরতটে বিশৃঙ্খল ভাবেই স্নানে নেমে পড়েন পুণ্যার্থীরা। ভোর থেকেই ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হয় সাগর উপকূলে। বৃষ্টি উপেক্ষা করেও ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা কাতারে কাতারে পুণ্যার্থীর ভিড়ে জমজমাট হয়ে ওঠে সাগরতট। আজ, শনিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত মকর সংক্রান্তির যোগ রয়েছে। এর পর দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে বিকেল সাড়ে ৩টে পর্যন্ত শাহি স্নানের যোগ রয়েছে। ফলে এই মাহেন্দ্রক্ষণেও হাজার হাজার পুণ্যার্থী স্নান পারবেন বলে প্রশাসনের অনুমান।

    জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, মেলার শুরু থেকে শুক্রবার সন্ধে পর্যন্ত ৭ লক্ষের বেশি পুণ্যার্থী সাগরে এসেছে। এ দিন বিকেল সাড়ে ৪টে নাগাদ গঙ্গাসাগর সমুদ্র সৈকতে নিজের ইষ্টদেবতাকে নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন মধ্যপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী উমা ভারতী। শঙ্খধ্বনির মধ্যে দিয়ে নিজের ইষ্টদেবতার পাশাপাশি নিজেও পুণ্যস্নান করেন। গঙ্গাসাগর মেলায় রাজ্য সরকারের ব্যবস্থাপনায় খুশি উমা বলেন, 'গঙ্গোত্রী থেকে গঙ্গাসাগর পর্যন্ত আমি একটি যাত্রা শুরু করেছিলাম। শারীরিক অসুস্থতা ও করোনা মহামারীর জন্য আমার সেই যাত্রা অনেকটাই পিছিয়ে গিয়েছে। আজ গঙ্গোত্রী গোমুখ থেকে মা গঙ্গাকে এনে গঙ্গাসাগরে আমি মেলবন্ধন করলাম।'

    দুপুর নাগাদ এক প্রৌঢ়াকে চিকিৎসার জন্য আকাশ পথে উড়িয়ে আনা হয়েছে। ৭৫ বছর বয়সি সাবিত্রী সালিকরাম বাওয়ানে নামে এই মহিলা মধ্যপ্রদেশ থেকে গঙ্গাসাগরে এসেছিলেন। ই-দর্শন পোর্টালে নজর রেখেছেন ২ কোটি ৭৮ লক্ষ মানুষ। দুবাই, লন্ডন, আমেরিকা সহ দেশের ২ লক্ষ ৭৮ হাজার মানুষ অফলাইন ও অনলাইনে স্নানের প্যাকেট সংগ্রহ করেছেন। ৭ তারিখ থেকে এ দিন পর্যন্ত ১০ লক্ষ মাস্ক বিতরণ করা হয়েছে।

    মকর স্নানে ব্যস্ত
  • Link to this news (এই সময়)