• 'মা...' বলে থেমে গেল চিরুর গলা
    এই সময় | ১৫ জানুয়ারি ২০২২
  • প্রবীর কুণ্ডু

    গুয়াহাটিগামী আপ বিকানের এক্সপ্রেস তখন রানিনগর, জলপাইগুড়ি রোড পার করে তিস্তা সেতুতে। ঝমাঝম আওয়াজ শুনে জানলা দিয়ে তাকিয়ে থাকেন চিরঞ্জিত। পড়ন্ত বেলায় তিস্তার রূপ দেখে মায়ের কথা মনে পড়ে তাঁর। ট্রেনের কোচে গা এলিয়ে ফোন করেন মাকে। তখনও আঁচ করতে পারেননি শেষবারের মতো মায়ের সঙ্গে সুখ-দুঃখের কথা হচ্ছে তাঁর। খোশমেজাজে হাসিঠাট্টা করতে করতেই হঠাৎ বিকট শব্দ। কেঁপে ওঠে গোটা কামরা। ছেলের গলার স্বর আর ঠিকমতো শুনতে পাননি ফুলেশ্বরী। ফোনের এপারে একরাশ চিন্তা তাঁর। মা জানতে চাইছেন, 'খোকা, কীসের শব্দ? ...সবাই চিৎকার করছে কেন? বল, বল চিরু...'।

    অস্পষ্ট গলায় ভেসে এল শেষ শব্দ। চিরুর জন্মের পর মুখ ফুটে বের হওয়া সেই অকৃত্রিম শব্দ- 'মা'। চিরু আর সাড়া দেয়নি।

    পাশ কাটিয়ে প্রাণ হাতে যাত্রীদের ছুটোছুটির আড়ালে পড়ে রইল মোবাইল ফোন। পড়ে রইল রক্তমাখা ছেলের দেহ। তখনও মায়ের মুঠোয় ধরা ছোট্ট ফোন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কোচবিহারের চান্দামারি গ্রামের বাড়িতে ছেলের মৃত্যুসংবাদ বয়ে নিয়ে এলেন প্রতিবেশীরা। গুম মেরে রইলেন মা ফুলেশ্বরী। সবেধন নীলমণি যে আর আর বেঁচে নেই, এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না তিনি।

    মৃত চিরঞ্জিৎ বর্মন (২৩)-এর পিসি শৈল বর্মন বলছিলেন, 'দুর্ঘটনার সময়ে ও মায়ের সঙ্গে ফোনে ছিল। বলছিল, ঘণ্টা তিন-চার পর বাড়ি ফিরবে। হঠাৎ বিকট আওয়াজ শুনে ওর মা চিৎকার করে ডাকতে থাকেন চিরুকে। আমি ঘরে ছিলাম। আতঙ্ক মাখানো গলার স্বর শুনে বাইরে এসে বলি, কী হয়েছে? জানেন তো, মা-মা বলেই ছেলেটা মারা গেল। নাড়ির টান হয়তো!'

    বৃদ্ধ বাবা-মাকে নিয়ে অভাবের সংসার ছিল চিরঞ্জিতের। বাবা নির্মল বর্মন মানসিক ভাবে অসুস্থ। শয্যাশায়ী। মা ফুলেশ্বরী বিড়ি বাঁধেন। চিরঞ্জিৎ আগে কোচবিহারে শহরে গিয়ে দিনমজুরের কাজ করত। তবে মাস ছয়েক আগে পেটে ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে জানতে পারেন, গলব্লাডারে স্টোন হয়েছে। অপারেশনের ধাক্কা প্রায় পঁচিশ হাজার টাকা। সেই টাকার বন্দোবস্ত করতেই বাড়ি ছেড়ে জয়পুরে গিয়েছিলেন চিরঞ্জিৎ ওখানে অনেক বেশি মজুরি। প্রতিবেশী বাটু মহন্ত বলেন, 'অপারেশনের জন্য প্রয়োজনীয় টাকা চিরঞ্জিতের কাছে ছিল না। তাই ছুটতে হয়েছিল ভিন রাজ্যে। সেখানে গিয়েও দিনমজুরি। তবে আয় বেশি। সেই টাকা জোগাড় করেই বাড়ি ফিরছিল। হয়তো ভেবেছিল, মায়ের মুখে একটু হাসি ফুটবে। তা আর হলো কোথায়?'

    বৃহস্পতিবার রাতেই ছেলের দেহ শনাক্ত করতে জলপাইগুড়ি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় ফুলেশ্বরীকে। একবার ইশারায় 'হ্যাঁ' বলে সেই থেকে মুখে খিল দিয়েছেন। পিসি শৈল বলছেন, 'জানেন তো, ওর ভূতের ভয় ছিল সেই ছেলেবেলা থেকে। সন্ধ্যা হলেই মায়ের পাশে, মায়ের আঁচল ধরে বসে থাকত। কলতলা, বাগান সবকিছু জুড়ে ছিল ওর মা। মা, মা বলেই চলে গেলে আমাদের আদরের ছেলেটা।'

    ট্রেন দুর্ঘটনায় মৃত চিরঞ্জিত বর্মন
  • Link to this news (এই সময়)