• LIC: আসতে চলেছে এলআইসি-র IPO, কতটা যুক্তিযুক্ত এই সরকারি পদক্ষেপ?
    আজকাল | ১৫ জানুয়ারি ২০২২
  • সুশান্ত সান্যাল: ১৯৫৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর জন্ম নিয়েছিল ভারতীয় জীবনবীমা নিগম ( Life Insurance Corporation of India), স্লোগান ছিল “योगक्षेमम् वहाम्यहम (yogakshemam vahamyaham) যে সংস্কৃত শব্দের অর্থ হল ‘Your welfare is our responsibility’।

    গীতা থেকে নেওয়া এই শব্দগুলো জানান দিত যে এটা মানুষের স্বার্থে বিশেষ সরকারি পদক্ষেপের একটা অংশ। দেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় ( ১৯৫৬-১৯৬১) যার অবদান ছিল ১৮৪ কোটি টাকা সেটা শেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ২০১৭-২০২২ এ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮,০১,৪৮৩ কোটি টাকা। মাত্র ৫ কোটি টাকা, ৩০০ অফিস আর ৫ মিলিয়ন পলিসি নিয়ে যার পথ চলা শুরু তার নিজস্ব অফিসের সংখ্যা এখন ১০ হাজারের ওপর আর পলিসিহোল্ডার-এর সংখ্যা প্রায় ৪০ কোটি ছাড়িয়ে, যার এজেন্টদের সংখ্যা প্রায় ১৪ লক্ষ আর কর্মী সংখ্যা প্রায় ১,১৫,০০০। নেট সম্পত্তির পরিমাণটা নেহাত কম নয়, প্রায় ৩৮ লক্ষ কোটি। আগস্ট, ২০০০-এ ভারতে খুলে দেওয়া হল বিমার ক্ষেত্র, লক্ষ্য ছিল বেসরকারি নিবেশ, এল অনেক কোম্পানি, বাড়ল প্রতিযোগিতা। কিন্তু তা সত্ত্বেও ২০২১ সালের মার্চ মাসের হিসেব বলছে যে দেশের সমস্থ বিমা কোম্পানিগুলোর মধ্যে তাদের বাজারের দখল এখনও প্রায় ৭৫ শতাংশ, আর সেখানেও সফল এলআইসি। শেষ কিছু বছরে সমস্ত অন্যান্য বিমা কোম্পানিগুলোর কমেছে এজেন্টদের সংখ্যা সেখানেও একমাত্র ব্যতিক্রম এলআইসি। শুধু তাই নয় ২০২০-২১ সালে ৯৯.৮৬ শতাংশ ক্লেম সেটেলমেন্ট-এর হিসেবে পৃথিবীতে এক নম্বরে ওঠে এসেছে এলআইসি-র নাম। প্রতি বছরে শুধুমাত্র দেশের অগ্রগতির জন্য ভারতীয় জীবন বিমার অবদান ৩.৫ লক্ষ কোটি থেকে ৪.৫ লক্ষ কোটি টাকা। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের উন্নতি কল্পে শেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ভারতীয় জীবন বিমার অবদান এখন পর্যন্ত প্রায় ৩১ লক্ষ কোটি টাকা যার মধ্যে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারগুলোর  সিকিউরিটিস, রাস্তাঘাট, সেচ ব্যবস্থা, বাড়িঘর তৈরি ইত্যাদি বিষয়েই বিনিয়োগ ২৪ লক্ষ কোটি টাকার ওপর। কর ব্যবস্থায় (আয়কর ও জিএসটি বাবদ) তাদের যোগদান ১০ হাজার কোটি টাকার ওপর। তাই অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে “LIC is a a transparent and efficient board-managed institution”। সুতরাং যেখানে দেশের বেশিরভাগ পাবলিক সেক্টর আন্ডার টেকিং (PSU) খারাপ পরিচালনায় উঠে গেছে বা যেতে বসেছে সেখানে ভারতীয় জীবন বিমা উল্টো পথে হেঁটে স্বচ্ছ ও শক্তিশালী ব্যবস্থাপনার নিদর্শন রেখেছে। ভারতের আর একটা বড় সমস্যা হচ্ছে NPA (Non Performing Assets) যার ফলে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা মুছে ফেলতে হচ্ছে ব্যাঙ্কগুলোর বই থেকে দুর্বল হচ্ছে ব্যাঙ্ক ব্যবস্থা সেখানেও উল্টো পথে হেঁটে ভারতীয় জীবন বিমা তৈরি করেছে নজির। তাদের net NPA Ratio হচ্ছে মাত্র .০৪১ শতাংশ যা আন্তর্জাতিক সীমারেখা অনুযায়ী একবারে নীচের সারিতে। কিছুদিন আগেই ভারতীয় জীবন বিমা ঘোষণা করেছে যে তারা খুব শীঘ্রই ভারতীয় রেল ব্যবস্থার উন্নতিকল্পে বিনিয়োগ করতে চলেছে ১.৫ লক্ষ কোটি টাকা আর ন্যাশনাল হাইওয়ের জন্য তারা ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত। দেশে আছে প্রচুর কোম্পানি আর এসেছে প্রচুর বিদেশি কোম্পানিও কিন্তু তাদের থেকে উন্নতিকল্পে এই অবদান কি কোনওদিন আশা করা যাবে? উঠছে প্রশ্ন। 

    ভারত সরকারের অর্থমন্ত্রক জানিয়েছে যে তারা বাজারে খুব শীঘ্রই আনতে চলছে ভারতীয় জীবন বিমার শেয়ার। তাই স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে, যে প্রতিষ্ঠানের পথচলা শুরু হয়েছিল মানুষের উন্নতির জন্য, তা কি বজায় রাখা সম্ভব হবে? ভারত সরকার জানিয়েছে যে প্রথম ৫ বছরে তাদের হাতে থাকবে ৭৫ শতাংশ আর ৫ বছর পরে তাদের হাতে থাকবে ৫১ শতাংশ এবং এই ৫১ শতাংশ বরাবর বজায় রাখবে সরকার তাই অহেতুক ভয়ের কিছু নেই। কিন্তু উদারীকরণের নাম করে একটা সরকারি লাভজনক প্রতিষ্ঠান কি ভাবে শেয়ার বাজারে বিক্রয় করা যায় সেটাই ভাবার । অনেকের মতে সরকার শুধুমাত্র তাদের বাজেটের ঘাটতি কমাতে এভাবে লাভজনক প্রতিষ্ঠান কীভাবে বেচতে পারে? যদিও সরকারের দাবি, ঠিকভাবেই রক্ষিত হবে পলিসি হোল্ডার, এজেন্ট এবং সাধারণ মানুষের স্বার্থ। কিন্তু নতুন পরিচালন সমিতি কি দেশের উন্নতির বিষয় সর্ব ক্ষেত্রে ছাড়পত্র দেবে না শুধুমাত্র তাদের মুনাফাই দেখবে সেটাই সন্দেহের বিষয়। তাই ভবিষ্যত কোন দিকে সেটাই দেখার।

     
  • Link to this news (আজকাল)