• বৈবাহিক ধর্ষণে 'ব্যতিক্রম?' কেউ বলছেন ছি ছি, কেউ বলছেন বেশ
    এই সময় | ১৫ জানুয়ারি ২০২২
  • অন্বেষা বন্দ্যোপাধ্যায়

    বৈবাহিক ধর্ষণ - এই শব্দবন্ধটি উচ্চারণ করা হলেই দু'টি বিরুদ্ধ মত উঠে আসে। কেউ দেশের আইন দেখিয়ে বলেন, এ রকম কিছুর অস্তিত্ব নেই, তাই 'বৈবাহিক ধর্ষণ' হতেই পারে না। অন্য দল বলে, আলবাত হতে পারে। এ প্রসঙ্গেই দিল্লি হাইকোর্ট সম্প্রতি মন্তব্য করেছে, 'যৌন কর্মীদের যদি তাঁর খদ্দেরকে 'না' বলার অধিকার থাকে, তা হলে বিবাহিত স্ত্রী কেন তাঁর স্বামীকে তা বলতে পারবেন না? কেন ধরে নেওয়া হবে বিয়ে মানেই সব কিছু স্ত্রীর সম্মতিতে হচ্ছে?' এই নিয়ে ধারাবাহিক শুনানি চলছে। যুক্তি ও পাল্টা যুক্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা চলছে যে বৈবাহিক ধর্ষণকে 'শাস্তিযোগ্য অপরাধ' ঘোষণা করে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৫ ধারার 'ব্যতিক্রম'কে বাতিল ঘোষণা করা হবে কি না।

    এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন উঠতেই কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ার প্রফেসর শমিতা সেন বলছেন, 'এক সময়ে মনে করা হতো, বিয়ের মাধ্যমে স্ত্রীর উপর যৌনাচারের অধিকার পেলেন স্বামী। সেই ভ্রান্ত ধারণার উপরেই এখনও অনেকাংশে দাঁড়িয়ে রয়েছে বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু স্ত্রী তো স্বামীর যৌন সামগ্রী নন, তা থাকবেনও না। অতি অবশ্যই আমি মনে করি এই 'ব্যতিক্রম' বাতিল হওয়া উচিত এবং তা শাস্তিযোগ্য অপরাধই।' তাঁর প্রশ্ন, আইন আসার পরে কী হবে, তা পরবর্তী প্রশ্ন। কিন্তু বিশ্বের ৫০টি দেশে যা স্বীকৃত, তা এখানে আনতে ক্ষতি কী?

    এই মতকেই আর একটু এগিয়ে নিয়ে গেলেন আইনজীবী দেবরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর সাফ কথা, 'আইনের দোহাই দিয়ে সব কিছু হয় না। স্ত্রীকে চড় মারলে শাস্তির বিধান আছে, খুন করলে আছে আর ধর্ষণ করলে স্বামী ছাড়া পেয়ে যাবেন?' তাঁর মতে, ভাবনাটাকে জাগ্রত করে তাকে বিপ্লবের পথে নিয়ে যেতে হবে, তা হলেই প্রথম পদক্ষেপ করা হবে।

    শমিতা এবং দেবরঞ্জন দু'জনেই মনে করেন, নারী হোক বা পুরুষ, শরীরের সার্বভৌম অধিকার তাঁর নিজের। তাঁর ইচ্ছাকেই তাই গুরুত্ব দিতে হবে। ফলে 'বৈবাহিক ধর্ষণকে শাস্তিমূলক অপরাধ' হিসেবেই দেখতে চান তাঁরা।

    এ প্রসঙ্গে সমাজতত্ত্বের শিক্ষিকা দেবারতি চক্রবর্তী জানালেন, বিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রে একটা দমনমূলক প্রতিষ্ঠান, যা মহিলার শরীরের উপর তাঁর নিজের অধিকার ও রিপ্রোডাক্টিভ চয়েসকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। বৈবাহিক ধর্ষণ আবার শরীরের উপর সার্বভৌম অধিকারকেই মুছে দেয়। সম্মতিতে যৌন সম্পর্ক যেখানে মূল, সেখানে বিয়ে তার বাইরে হবে কেন? আমি মনে করি, আইন আনার সময় হয়ে গেছে।'

    তবে বৈবাহিক ধর্ষণ আছে তা মেনে নিয়েও প্রাক্তন পুলিশকর্তা পঙ্কজ দত্ত বলছেন, '৯৯.৯ শতাংশ ক্ষেত্রে এর কোনও রিপোর্ট হয় না। তার মূল দু'টি কারণ হলো সোশ্যাল স্টিগমা অর্থাৎ সামাজিক কলঙ্ক এবং আর্থিক নিরাপত্তাহীনতা। সেটাকেই এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কাজে লাগায় ও বৈবাহিক ধর্ষণকে বৈধতা দেওয়া হয়। এখানে মেল শভিনিজ্‌মও একটা বিরাট ব্যাপার।'

    বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশে কর্মরত DIG ও SP পযমর্যাদার দুই অফিসারও মনে করেন, বৈবাহিক ধর্ষণকে আর ব্যতিক্রম হিসেবে দেখা উচিত নয়। তবে তাঁরা সাবধানী। এসপি পযমর্যাদার ওই অফিসারের বক্তব্য, 'মেডিকো-লিগ্যাল দিক থেকে বৈবাহিক ধর্ষণ প্রমাণ করা খুব কঠিন। প্রাথমিক ভাবে তা প্রমাণ করা না গেলে, পরবর্তী মামলা এগোবে কী করে?' তাঁর কথায়, 'এই বিষয়ে সন্দেহ নেই যে ধর্ষণ একটি অপরাধ। কিন্তু আইনে যদি সব দিক খুব সূক্ষ্ম ভাবে উল্লেখ না-থাকে, তা হলে তার অপব্যবহার হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা আছে, যেমন ৪৯৮A-র ক্ষেত্রে হয়ে থাকে।'

    একই মত আইনজীবী অরিজিৎ ভূষণ বাগচী ও দেবরঞ্জনের। অরিজিৎ বলছেন, 'আইন যদি আসে, তা হলে খুব সাবধানে পদক্ষেপ করতে হবে, তা না-হলে স্ত্রীদের হাতে একটা অস্ত্র তুলে দেওয়া হবে। আমি ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি বৈবাহিক ধর্ষণের বিরুদ্ধে আইন থাকা উচিত। তবে এ-ও ঠিক এটা সমাজব্যবস্থার বর্তমান কাঠামোর উপর বিরাট প্রভাব ফেলবে। বিষয়টা যদি 'চোখের বদলা চোখ' হয়, তা হলে এর প্রয়োজনীয়তা নিয়েই প্রশ্ন উঠে যাবে।'

    তবে আইন আসুক, তা চান না পুরুষ অধিকার কর্মী নন্দিনী ভট্টাচার্য। তাঁর সাফ কথা, 'স্বামীর-স্ত্রীর সমস্যা বিছানায় মেটানো যায়। কারণ শরীর কথা বলে। এই আইন এলে বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠানটি ধ্বংস হয়ে যাবে। আমরা সমাজব্যবস্থাকেই নষ্ট করতে চাইছি।'

    এর পরিপ্রেক্ষিতে শমিতা সেনের প্রশ্ন, 'তা হলে তো আমরা স্বীকার করেই নিলাম, বৈবাহিক ধর্ষণ একটা সত্য যার উপর সংসার ও সামাজিক গঠন নির্ভর করে আছে। সেটা কী করে হতে দেওয়া যায়?'

    কাজেই পঙ্কজ দত্তের কথা সূত্র ধরে বলা যায়, 'বিভিন্ন জায়গা থেকে বুদবুদ উঠছে। তা থেকে ঢেউ সৃষ্টি হতে এখনও বহু দেরি। কারণ এখনও সে ভাবে আলোড়নই ওঠেনি।'

    ফলে যত দিন তা বিপুল তরঙ্গ হয়ে আছড়ে পড়ছে, তত দিন অর্থাৎ আইন আসা পর্যন্ত বৈবাহিক ধর্ষণের স্বীকৃতি হয়তো সোনার পাথরবাটি হয়েই থেকে যাবে।
  • Link to this news (এই সময়)